‘হুমকির কথা জানিয়ে মানুষকে ভীত করতে চাই না’


June 9, 2019

জবাবদিহি রিপোর্ট : বাংলাদেশের ওপর নিরাপত্তাজনিত হুমকি সবসময়ই থাকে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হুমকির কথা জানিয়ে মানুষকে ভীত করতে চাই না। এবারের ঈদ জামাত ও ঈদ উৎসব সুষ্ঠুভাবে শেষ হওয়ায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

রোববার বিকাল ৫টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারী বাসভবন গণভবনে জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ডে ১১ দিনের সফর শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হুমকি সবসময় আসে, অনেক হুমকি। সব বলে মানুষকে ভীত করতে চাই না। আমাদের গোয়েন্দাদের কাছে সব তথ্য আছে। তারা সে অনুযায়ী তৎপর। ঈদের দেশের বাইরে ছিলাম। তবু সব তথ্যই আমার কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু আমরা প্রস্তুত। আমি শুধু এটুকু বলব, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী সবাই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। যে জন্য সুষ্ঠুভাবে ঈদের জামাত শেষ হয়েছে। প্রতিটি জামাত শেষ হওয়ার পর মেসেজ গেছে। শোলাকিয়ায় এর আগে ঘটনা ঘটেছে। এবার কোথাও কিছু হয়নি। আমাদের বড় শক্তি, আমাদের জনগণ খুব সচেতন। তাদের কাছে আবেদন, তারা যেন সজাগ থাকেন, সতর্ক থাকেন।’

এ ধরনের ঘটনা দেশের উন্নয়ন ব্যাহত করে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের ৮ শতাংশ জিডিপি। এটা ধরে রাখতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রয়োজন। এর জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের কাছেও সেই সহযোগিতা চাই। কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের দ্রুত অগ্রযাত্রা যেন ব্যাহত না হয় সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’

যতোই ভিআইপি হোক, চেক ছাড়া ইমিগ্রেশনে প্রবেশ নয়
যে যতো বড় ভিআইপি হোক না কেন, কাউকে ইমিগ্রেশনে চেক ছাড়া প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন: যখনি আমি বিমানে উঠি, তখনি একটা ঘটনা ঘটে। পাসপোর্ট ফেলে রেখে যেতেই পারে, কিন্তু ইমিগ্রেশন কেন চেক করেনি? ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করতে হলে সেখানে টিকিট কেটে যেতে হবে। এট হয়তো অনেকের পছন্দ হবে না। তারপরও করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আগের সরকার কী করেছে বিমান নিয়ে, তা আপনাদের জানা থাকার কথা। আমরা যখন বিমানের সংখ্যা বাড়িয়ে আরো কয়েকটি নতুন রুটে যাওয়ার চিন্তা করছি। ঠিক তখনি বার বার এমন ধরনের ঘটনা ঘটছে।

তিনি আরও বলেন, কারা কারা এসব করছেন, তাদের খুঁজে বের করা হবে। দেখা যায়, বিমানে সিট খালি থাকে। অথচ অনেকে সিট পায় না। যারা সিট নিয়ে ব্যবসা করেছে, তাদের আঁতে ঘা লাগতে পারে। তাই তারা হয়তো বিমান নিয়ে বার বার ঘটনা ঘটাচ্ছে।

তারেকের শাস্তি কার্যকর হবেই
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তারেককে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলোচনা চলছে । আজ হোক কাল হোক শাস্তি কার্যকর হবে ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন: যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে এত মানুষ মেরেছিল, ১০ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে এসেছিল, এতিমের টাকা মেরেছে, তাদের জন্য কিছু লোকের এত মায়া কান্না কেন? তারকেকে কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলাপ চলছে। আজ হোক কাল হোক একটা সময় তার বিচার হবেই।

চাপ থাকলে ‘যা চান তা লিখতে পারেন না’ বলতেন না
একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার সম্পাদক গণমাধ্যমে বলেছেন, তিনি যা চান তা লিখতে পারেন না। ওই সম্পাদকের উপরে কোনো চাপ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন: যদি সত্যিই তার উপর কোনো চাপ থাকতো তাহলে ওই সম্পাদক ‘যা চান তা লিখতে পারেন না, এই’ কথাটাও বলতে তো পারতো না। কেনো চাপ নাই বলেই তিনি এভাবে বলতে পারছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের লোকেরা কোনো গণতন্ত্র পছন্দ করেন না। তারা চায় জরুরি সরকার। এতে তাদের লাভ হবে। তাই এমন কথা বলে। আগে ডিজিএফআই তাকে অনেক নিউজ দিয়েছে। এটা ‘তিনি’ বলেছেনও একটা টক শো’তে। তিনি বলেছিলেন যে, ডিজিএফআই তাকে দিয়েছে, তাই তিনি লিখেছেন। এখন দিচ্ছে না হয়তো। তাই তিনি লিখতে পারছে না। তার মানে কোনো ফরমায়েশি লেখা লিখতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমি বলবো ‘তিনি’ যা ইচ্ছা লিখুক। অনেকেই তো অনেক লিখছে। তাতে কিছু যায় আসে না। আমি দেশের জন্য কাজ করছি। কে কী লিখলো, কী বলল, তাতে কিছু যায় আসে না। তিনি লিখুক, যত খুশি লিখুক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি’ যদি চান ডিজিএফআই তাকে সাপ্লাই দিক তাহলে তাদের সাথে যোগাযোগ করুক।

সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়
জাপান সফর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে আমরা চলব জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন: প্রতিটি দেশই জানে, সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চমৎকার সম্পর্ক আছে।

তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, আমাদের ভালো হোটেল ছিল না, সোনারগাঁও হোটেল জাপান সরকার তৈরি করে দিয়েছিল। বন্ধুপ্রতীম দেশ। এবার সফরে নতুন সম্রাট ও আগের সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক আগ্রহ তাদের।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যাই, বলি, আমাদের সবার কমন এনিমি আছে, দারিদ্র্য। আসুন, আমরা সাধারণ মানুষের উন্নতিটা করি। সেখানে যত খরচ লাগে, ব্যয় করি। দারিদ্র্যই আমাদের সবার বড় শত্রু। এর বিরুদ্ধে সবাইকে লড়াই করতে হবে।

বেহেশত থেকে তো কোনো মেসেজ আসেনি!
যারা জঙ্গি হামলা করছে, তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন: তারা হামলার পর বলে, তারা বেহেস্তে যাবে। কই বেহেস্ত থেকে তো কোনো মেসেজ আসেনি! তাহলে তারা কেন আল্লাহর ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, আগে ধারণা করা হতো কওমি মাদ্রাসার ছেলেরা সন্ত্রাসী হামলার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু এখন দেখা যায়, ইংরেজী মাধ্যমের ছেলেরা এসব হামলায় যুক্ত। তারা ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশুনা করে। তাদের সব ইচ্ছাই বাবা, মা পূরণ করে। তাদের কোনো অভাব নাই। অথচ তারা বেহেস্তে যেতে মানুষ খুন করছে। মানুষ খুন করে কি বেহেশতে যাওয়া যায়?

তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক মুসলিম দেশে সন্ত্রাস চলছে। মুসলামানরাই মুসলমানদের মারছে, রক্ত ঝরাচ্ছে। কিন্তু এতে লাভবান হচ্ছে কারা? যারা অস্ত্র তৈরি করে, যারা অস্ত্র রপ্তানি করছে, তারাই লাভবান হচ্ছে।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে। তৈরি করা হবে বিশ্বমানের পর্যটন এলাকা।

তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে যে বিমানবন্দর আছে সেটাকে আরও আধুনিক মানের করা হবে। আপনারা জানেন, কক্সবাজার হলো বিশ্বের একটি অন্যতম আন্তর্জাতিক রুট। এখানকার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের হলে বাহিরের বিমানগুলো এখানে ট্রানজিট সুবিধা পাবে এবং বিদেশি পর্যটকরা কক্সবাজার ঘুরে দেখবে।’

তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকদের জন্য পৃথক বিচ এরিয়া (সমুদ্র সৈকত এলাকা) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে তাদের জন্য।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৮ মে জাপান দিয়ে ত্রিদেশীয় এই সফর শুরু করেন শেখ হাসিনা। পরে সেখান থেকে সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ড যান তিনি। সফরে তৃতীয় ও শেষ দেশ ফিনল্যান্ড থেকে শনিবার (৮ জুন) সকালে দেশে পৌঁছান তিনি।

ত্রিদেশীয় এই সফরের শুরুতেই জাপানের টোকিওতে ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাপানের সঙ্গে আড়াইশ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি সই হয় তার সফরে।

জাপান সফর শেষে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) চতুর্দশ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ৩০ মে শেখ হাসিনা সৌদি আরবে যান। সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর পবিত্র ওমরাহ পালন করেন তিনি, জিয়ারত করেন মহানবীর (স.)-এর রওজা।

সৌদি আরব থেকে গত ৩ জুন ফিনল্যান্ড যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ৪ জুন দেশটির প্রেসিডেন্ট সাউলি নিনিস্তোর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। পরদিন ৫ জুন অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ ও ফিনল্যান্ড আওয়ামী লীগ তার সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী সেই অনুষ্ঠানেও যোগ দেন।

0 30

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের সংবাদ শিরোনাম :
%d bloggers like this: