আগস্ট ৩, ২০২১

শুকনো মৌসুমেও তলিয়ে যাচ্ছে নদীরক্ষা বাঁধ, উৎকন্ঠায় পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা

১ min read
শুকনো মৌসুমেও তলিয়ে যাচ্ছে নদীরক্ষা বাঁধ, উৎকন্ঠায় পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা

শুকনো মৌসুমেও তলিয়ে যাচ্ছে নদীরক্ষা বাঁধ, উৎকন্ঠায় পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধিঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের ছয়রশিয়া থেকে হড়মা পর্যন্ত পদ্মায় ৩ বছর আগে নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে গত প্রায় ৩ মাস থেকে শুকনো মৌসুমেও পদ্মায় তলিয়ে যাচ্ছে রক্ষা বাঁধ।

এতে হাজারো উদ্বেগ-উৎকন্ঠা নিয়ে দিন পার করছে প্রায় ১ কিলোমিটার জুড়ে পদ্মাপাড়ে বসবাস করা বাসিন্দারা। নদী ভাঙ্গনের কারণে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি। শুষ্ক মৌসুমে হঠাৎ পদ্মা নদীর এমন আগ্রাসী ভাঙ্গনে ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাঠ, মসজিদ, গোরস্থানসহ হাজার হাজার বসতবাড়ী ও হাজারো একর ফসলি জমি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা তীরবর্তী হড়মা ঘাট এলাকায় থাকা নদী রক্ষা বাঁধের ১ কিলোমিটারের মধ্যেই প্রায় ১৫-২০টি জায়গা বøকসহ নদীতে তলিয়ে গেছে। মাত্র ৩ বছরেই বাঁধ তলিয়ে যাওয়ার কারন হিসেবে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।

গত কয়েক বছরে ১০-১২ বার বাড়ি ভাঙতে হয়েছে ষাটোর্ধ আনোয়ার হোসনকে। অনেক আশা নিয়ে বাঁধের পাশে বাড়ি করেছেন গত বছর। তবে রক্ষা বাঁধ তলিয়ে যেতে শুরু করায় মাথায় হাত আনোয়ার হোসেনের। তিনি বলেন, বøক বিছানো ৩ বছর হলো, তাতেই তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।

হঠাৎ করে রাত-বিরাতে ব্লক খসে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে কিভাবে থাকবো আমরা? রক্ষা বাঁধ থাকলেও যে অবস্থা, না থাকলেও একই অবস্থা আমাদের।

হড়মা দানেশ আলীর টোলা গ্রামের আলহাজ্ব আমজাদ আলীর ছেলে মো. টিপু সুলতান জানান, মরা নদীর মুখ থেকে হড়মা ঘাট পর্যন্ত অন্তত ২০ জায়গায় এমন ভাঙ্গন হয়েছে। বাঁধ ভেঙে এই এলাকার সবকিছুই অনেক ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।

এখানকার মানুষ এখন নিরুপায় হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। সত্তর বছর বয়সী প্রবীণ আজহার আলী জানান, বারবার বাড়ি ভাঙছি, বারবার নদী ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে। জমিজমা হারিয়ে অন্যের আম বাগানে ১০ হাজার করে ভাড়া দিয়ে বসবাস করছি।

দিনমজুর সাত্তার আলী বলেন, নদীর ভাঙ্গনে সবকিছু হারিয়েছি। এই মূহুর্তে কোন জায়গা-জমি নাই। পরের জায়গায় বসবাস করছি। এতো কম সময়ে কিভাবে ভাঙলো?

অব্যশই কাজে গাফেলতি আছে, তাই বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। “ভাঙ্গন শুরু হলেই চোখে পানি চলে আসে” এমনটা জানিয়ে মেসের আলীর স্ত্রী নাজমা বেগন বলেন, নদীর পানি ভরপুর ছিলো তখনো ভাঙ্গন ছিলো না। অথচ এখন ভাঙ্গন হচ্ছে।

ভাঙন কবলিত এলাকার রহিমা বেগম বলেন, ৩ মাস আগের ভাঙ্গনে ঘরবাড়ী হারিয়ে মনের চাপা কষ্ট আর বুকভরা বেদনা নিয়ে অন্যের জমিতে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে কুড়ে ঘরে বসবাস করছিলাম। ঐ সময়ের ভাঙ্গন থেকে রেহাই পাওয়া ১২ শতাংশ জমিতে টমেটোর চাষ করেছিলাম।

অসময়ে হঠাৎ নদী ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে আমার শেষ সম্বল টুকু। এখন আমার দারানোর কোন জায়গা নেই। এই ভাঙ্গন আমার জীবনের প্রথম নয় এর আগে ও আরো তিন বার ভেঙ্গেছে, তবে এবার নিঃস্ব হলাম।

পদ্মা পাড়ের এক গ্রাম্য চিকিৎসক জানান, ভাঙন মৌসুমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা নদী শাসনের আশ্বাস দিলেও তার কোন বাস্তবায়ন নেই। যে কারণে প্রতি বছর পদ্মা নদীর ভাঙনে বসতি ও আবাদি জমি নদী গর্ভে চলে যায়।

তিনি বলেন, এখন শুকনো মৌসুম। নদী শাসনের উপযুক্ত সময়। কিন্তু তার কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমরা কোন চাল বা গম চাই না, চাই নদী শাসন।

দেবীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম বলেন, নদীর পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমের মতোই অসময়ে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি, খুব দ্রুতই কাজ শুরু হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদ বলেন, বিভিন্ন সময়ে বাঁধ নির্মানের লক্ষ্যে মন্ত্রী ও সচিব বরাবর কয়েকদফা ডিও লেটার দিয়েছি। চরবাগডাঙ্গা ও দেবীনগর এলাকার নদী রক্ষা বাঁধ নির্মানে ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। প্রকল্পের কাজ খুব দ্রুত সময়ে শুরু হবে বলে জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান মুঠোফোনে জানান, হড়মা ঘাটের নদী রক্ষা বাঁধ তলিয়ে যাওয়ার মূল কারন হলো, সেখানকার ভিন্ন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।

পদ্মা-মহানন্দার মোহনা ও অতিরিক্ত গভীর হওয়ায় এমনটি হতে পারে। বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরো বলেন, কয়েক দফার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। খুব শীগ্রই কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *