আগস্ট ৫, ২০২১

শিশুর খাবারে অনীহা মোকাবিলায় করণীয়

১ min read

ডাঃ লুনা পারভীন
শিশু বিশেষজ্ঞ, বহির্বিভাগ
ঢাকা শিশু হাসপাতাল।

বাচ্চাদের খাবারে অনীহা নিয়ে বাবা-মায়ের অভিযোগের শেষ নেই। আসুন তাহলে জেনে নিই শিশুর খাবারে অনীহা দূর করতে আমরা কি কি কাজ করতে পারি।

নবজাতকদের বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে :

১. মায়ের গায়ের সাথে বাচ্চার গা লাগিয়ে দুধ খাওয়াতে হবে।

২. আগে যেভাবে আপনি খাওয়াতেন সেভাবে না খাইয়ে অবস্থান পরিবর্তন করে খাওয়ান।

৩. এই সময়টাতে কোনো ধরনের ফিডার, চুষনী, প্যাসিফায়ার দেয়া যাবে না। তবে দাঁত হওয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বা মায়ের নিপলে ব্যথা থাকলে নিপল সিল্ড বা প্লাস্টিকের কভার নিপলের উপর দিয়ে চুষতে দেয়া যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে জীবানুর আক্রমণ, মায়ের ব্রেস্টে ইনফেকশন বা বুকের দুধ খম পাওয়ার মতো সমস্যাগুলো হতে পারে।

৪. জেগে থাকা অবস্থায় না খাওয়াতে পারলে প্রাথমিকভাবে ঘুমঘুম ভাবে এলে চেষ্টা করবেন যেন নবজাতক টানা ৪-৫ ঘন্টা না খেয়ে থাকার মত অবস্থা না হয়। তবে সারাদিনে ২৪ ঘন্টায় বাচ্চাকে অন্তত মোট ১২-১৮ ঘন্টার ঘুম দিতে হবে।

বুকের দুধ না পেলে যা করতে হবে :

১. পেশাব ঠিক থাকলে কোনো ফর্মুলা বা ফিডার দেয়ার কথা ভুলে যান (বুকের দুধ দিতে সমস্যা আছে এমন মায়েরা বাদে)।

২. প্রয়োজনে মা বেশী করে পানি, দুধ, তরল খাবার, গুড়ামাছ, সবজি, কালিজিরা খাবেন। বিশেষ করে বুকের দুধ দেয়ার আগে পরে ২

গ্লাস পানি খাবেন।

৩. বাচ্চার সাথে মায়েরও পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের প্রয়োজন আছে।

৪. দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকার জন্য মা গান শুনতে পারেন, বই পড়বেন, গরম পানিতে গোসল নিতে পারেন।

৫. বুকের দুধ বাড়ানোর জন্য গরম সেক, ম্যাসাজ, পাম্পের মাধ্যমে কিছু দুধ বের করে নেয়া যেতে পারে।

বুকের দুধ বাড়ানোর একমাত্র উপায় মাকে সুস্থ ও টেনশন ফ্রি রাখা যা একমাত্র তার পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া কোনভাবেই সম্ভব নয় অথচ এই দিকটা আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত ও উপেক্ষিত।

বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খাদ্যে অনীহার সমাধান :

১. অসুস্থ, মুখে আঘাত বা ঘা এসব সাময়িক সমস্যা। এসব ক্ষেত্রে তরল খাবার বা অল্প অল্প করে বার বার খাওয়ানো, চামচে করে খাবার গিলতে দেয়া যেতে পারে।

২. দাঁত ব্রাশ করার সময় ২ বেলা জিহ্বাও আস্তে আস্তে ব্রাশ করে দিতে হবে যেন জিহ্বায় ময়লা না জমে।

৩. বাচ্চাকে খাবারে আগ্রহী করে তোলার জন্য খাবার তৈরির সময় বাচ্চাকেও আপনার সাথে নিন সাহায্য করার জন্য। তাকেও মতামত দিতে দিন।

৪. খাবার পরিবেশনের সময় খাবার ডিজাইন করা, ঘরবাড়ি, কার্টুন আকা, ছোট পশুপাখি তৈরী করা, খাবারগুলো বাচ্চার খেলনা হাঁড়িপাতিল বা থালাবাটিতে দেয়া, খাবার নিয়ে গল্প তৈরি করা। এভাবে খাবারের পরিবেশটা বাচ্চার জন্য আনন্দদায়ক করা যেতে পারে ভীতি দূর করার জন্য।

৫. মোবাইল, টিভি বন্ধ করে ছড়া গান বা গল্পের মাধ্যমে বা পরিবারের সবাই একসাথে বসে গল্পগুজবের মাধ্যমে বাচ্চার আগ্রহ তৈরি করতে পারেন খাবারে।

৬. বাচ্চাকে নিজ হাতে খেতে উৎসাহিত করুন। বার বার খাওয়ার জন্য বিরক্ত না করে, টেবিলে খাবার রেখে আসুন ও বাচ্চাকে খিদে লাগলে নিজেই খাবার খুঁজে খেতে দিন।

৭. কখনোই জোর করবেন না বা চাহিদার অতিরিক্ত খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না। তরল বা ব্লেন্ড করা খাবার খেতে না দিয়ে বাচ্চাকে চিবিয়ে খেতে উৎসাহিত করুন।

৮. আস্তে আস্তে করে খাবারের পরিমাণ ও সময় বাড়ান। এক দুই চামচ ১০ মিনিট পর্যন্ত খেলো এর পর বন্ধ। আবার ৬-৭ চামচ ১৫-২০ মিনিট সময় ধরে খেলো। তবে আধা ঘণ্টার পর আর কোন খাবার দিবেন না। তাহলে আবার হজমে সমস্যা হবে।

চিকিৎসা যখন প্রয়োজন :

১. দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে, স্বাস্থ্য কমতে থাকলে চিকিৎসা করাতে হবে।

২. রক্তস্বল্পতা রোগ থাকলে আয়রন, ফলিক এসিড ও আয়রন যুক্ত খাবার যেমন মুরগির কলিজা, কাঁচা কলা, লাল শাক, রঙিন শাকসবজি খাওয়াতে হবে।

৩. আচরণগত সমস্যা বা অটিজমের লক্ষণ থাকলে কাউন্সেলিং ও শিশু বিকাশ কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে হবে।

বাচ্চার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে, খাবারকে ভীতিকর কিছু ভাবতে দেয়া যাবেনা। বাচ্চাকে উৎসাহিত করুন তার নিজের খাদ্য তালিকা বাড়ানোর জন্য, প্রতিবার নতুন খাবারের জন্য তাকে পুরস্কৃত করুন, খাবার দিয়ে গল্প তৈরী করতে দিন এবং কিছু দিন পর পর তার উন্নতিগুলো পর্যালোচনা করুন।

আগেরকার দিনে দশ বারোটা বাচ্চা নিয়ে যৌথ পরিবারে মায়েদের এত সময় ছিল না বাচ্চাদের খাবার নিয়ে ঝামেলা করার। তাদের সন্তানদের সন্তানরা আজ বাবা মা হয়েছেন। এখন একটা বাচ্চা। তবুও যেন বাচ্চা নিয়ে দুঃশ্চিন্তার শেষ নাই। বাচ্চার দুধে আলতা রং হতে হবে, আপেলের মতো গাল হতে হবে, আইস্টাইনের মতো জ্ঞানী হতে হবে, বিল গেটসের মতো সফল হতে হবে, পড়ালেখায় টপার হতে হবে, নাচ-গান ছবি আঁকায় পারদর্শী হতে হবে, পাশের বাড়ির বাচ্চার থেকে এগিয়ে থাকতে হবে-এ রকম অরো কত কী যে এখনকার বাবা-মায়েরা চান! আর এজন্য চার্ট করে গুগল ঘেঁটে বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার বানিয়ে খাওয়াতে হবে সে যেভাবেই হোক। সবকিছুতেই এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা কি আসলেই শিশুকে মানুষ হয়ে গড়তে সাহায্য করছে নাকি অসুস্থ, অমানুষ বানাচ্ছে বলুন তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *