সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে ফাঁসির রায় বহাল থাকলো আজহারুলের

১ min read

নিউজ ডেস্ক: এবার মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর আগে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত রংপুরের আল-বদর কমান্ডার হিসেবে পরিচিত ও জামায়াত নেতা এ. টি. এম. আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ মোট ৯টি অপরাধের ৬টি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার শুরু হয়।

এসব অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে জামায়াতের সাবেক ভারপ্রাপ্ত জেনারেল সেক্রেটারি আজহারুল ইসলামের করা আপিল আবেদনের রায় আজ দেয়া হবে।

আজহারুলের বিরুদ্ধে ৬ অভিযোগ

প্রথম অভিযোগ- ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ থেকে ২৭ মার্চের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাসানী (ন্যাপ) নেতা ও রংপুর শহরের বিশিষ্ট আয়কর আইনজীবী এওয়াই মাহফুজ আলীসহ ১১ জনকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাদের ৩ এপ্রিল রংপুর শহরের দখিগঞ্জ শ্মশানে নিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়, যা অপারেশন সার্চলাইটের অংশ ছিল।

দ্বিতীয় অভিযোগ- একাত্তরের ১৬ এপ্রিল আজহার নিজ এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জের ধাপপাড়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মিলে থানার ১৫ জন নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করেন।

তৃতীয় অভিযোগ- ১৭ এপ্রিল রংপুরের বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ারবিল এলাকায় লুণ্ঠন ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং গণহত্যা চালিয়ে ১ হাজার ২শ’রও বেশি নিরীহ মানুষকে হত্যা করেন। এর সঙ্গে, অভিযোগে আরও বলা হয়, ঝাড়ুয়ারবিল গণহত্যায় ২০০ হিন্দু ধর্মের হত্যা করা হয়, যা একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে নিধনের উদ্দেশ্যই প্রকাশ করে।

চতুর্থ অভিযোগ- ১৭ এপ্রিল কারমাইকেল কলেজের চারজন অধ্যাপকসহ অপর এক অধ্যাপকের স্ত্রীকে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে অপহরণ করে দমদম ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন।

পঞ্চম অভিযোগ- ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে রংপুর শহর ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন বয়সের নারীদের ধরে এনে টাউন হলে আটক রেখে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করেন। একইসঙ্গে নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিদের অপহরণ, আটক, নির্যাতন, হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম, হত্যা ও গণহত্যা চালানো হয়।

ষষ্ঠ অভিযোগ- নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায় এক ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। ১ ডিসেম্বর রংপুর শহরের বেতপট্টি থেকে একজনকে অপহরণ করে রংপুর কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে নিয়ে আটক রেখে নির্যাতন ও হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম করেন।

ট্রাইব্যুনালের তদন্তে বলা হয়, আজহারের প্রত্যক্ষ নির্দেশে রংপুর কারমাইকেল কলেজের পাশে দমদমা এলাকায় আল-বদর সদস্যরা কলেজের ৬ শিক্ষক ও এক শিক্ষক পত্নীকে হত্যা করা হয়। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে আজহারুল রংপুরের টাউন হল বধ্যভূমির ৭০ জনের সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীর নেতৃত্ব দিতেন, যা টর্চারসেল হিসেবে পরিচিত।

তদন্তে আরও বলা হয়, রংপুর অঞ্চল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর আজহার রংপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে নিজামী ও মুজাহিদের নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবী নিধন প্রক্রিয়াই আজহার যোগ দেন।

পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আজহার পালিয়ে সৌদি আরব চলে যান। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি দেশে ফেরে জামায়াতের রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হন।।

আজহারুলকে গ্রেফতার ও তদন্ত শুরু

আজহারের মামলায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা থেকে তদন্ত শুরু করা হয় ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে। মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ইদ্রিস আলী।

২০১২ সালের ২২ আগস্ট তাকে গ্রেফতার করা হয় মগবাজারের বাসা থেকে। এর আগে ওই দিন সকালে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল।

২০১৩ সালের ১৮ জুলাই আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউশন। পরে গত ২৫ জুলাই, ২০১৩ অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর ছয়টি অপরাধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আজহারের বিরুদ্ধে মামলার বিচার কাজ শুরু হয়।

পরে ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করে ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট থেকে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্ততর্ক শুরু হয়ে চলে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত।

২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আজহারের আইনজীবী।

২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শেষে আজহারের বিরুদ্ধে যে কোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আজহারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউশনের আনা নয় ধরনের ছয়টি অপরাধের মধ্যে পাঁচটি এবং পরিকল্পনা-ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) প্রমাণিত হয় রায়ে।

পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে আজহারের আপিল আবেদনের ওপর রাষ্ট্র ও আসামি উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত ১০ জুলাই প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছিলেন। আজ সেই আপিলের রায় হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *