সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১

যুবলীগের বড় দুই পদপ্রত্যাশীরা যারা

১ min read

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ৭ম কংগ্রেস আগামী ২৩ নভেম্বর।তারিখ ঘোষণা হলে প্রতিবারই উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করে যুবলীগ নেতাকর্মীদের মাঝে। যে যার অবস্থান থেকে তাদের প্রার্থিতা জানান দেন।দলটির বড় পদপ্রত্যাশীরা লবিং-তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করেন।
কিন্তুএবারের চিত্রটা একটু অন্য রকম। যুবলীগ নেতাদের ভাষায় এবারের কংগ্রেস হচ্ছে ‘বৈরী’ পরিবেশে। ক্যাসিনো ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ ডেরা। সংগঠনের ঢাকা মহানগর কমিটি থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্ব অনেকের বিরুদ্ধে উঠে ক্লাব ব্যবসার আড়ালে অবৈধ জুয়াপরিচালনা কিংবা এই অবৈধ ব্যবসা থেকে সুবিধাভোগের অভিযোগ। এসব অভিযোগে যুবলীগের মাঠ কাঁপানো বাঘা বাঘা নেতাদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন, রিমান্ডে আছেন। যারা বহিষ্কার কিংবা গ্রেফতার হননি তারাও রয়েছেন আতঙ্কে। এ কারণে এবারের কংগ্রেসে পদপ্রত্যাশী অনেক নেতা চুপসে গেছেন। প্রার্থিতা ঘোষণা নিয়ে ভয়ে আছেন।
দলটি হিসেবে যুবলীগের প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি বদনামও কম নয়। সেটি নেতৃত্বের কারণেই। চলমান মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যুবলীগের প্রভাবশালী নেতাদের নাম চলে আসছে। অনেকে গ্রেফতারও হয়েছেন। অনেকে গ্রেফতারের অপেক্ষায়। প্রতিষ্ঠার পর এবারের মতো এতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি যুবলীগ কখনও পড়েছে কিনা সেটি তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। যুবলীগ নেতাদের টেন্ডারবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে টানা তিনবার ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের অর্জন ম্লান হতে বসেছে।১৯৭২ সালের নভেম্বরে শেখ ফজুলল হক মণির হাত ধরে যুবলীগের পথচলা শুরু। এর পর থেকে যারাই যুবলীগের নেতৃত্বে এসেছেন প্রত্যেকেরই দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সম্পন্ন ছিলেন। তাদের মেধা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল আকাশচুম্বি।আগামী ২৩ নভেম্বর বেলা ১১টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।অন্যান্য সময় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার সম্মেলন শেষে কেন্দ্রের সম্মেলন হতো। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মহানগর শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠানের পক্ষে নয় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড; কারণ সম্প্রতি ক্যাসিনো কারবারের দায়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার হয়েছেন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ অনেকেই।ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা যুবলীগের অনেক নেতাও রয়েছেন দৌড়ের ওপর। সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো যুবলীগের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী চেয়ারম্যান ওমর ফারুককে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সভা। সেই সভা থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতির নির্দেশে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেয় যুবলীগ।যুবলীগের কাউন্সিলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কমিটিতে, এটি নিশ্চিত। ক্যাসিনো ব্যবসায়ী, দুর্নীতি ও টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ নেতারা বাদ পড়বেন। নেতৃত্বে আনা হবে ক্লিন ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের। আসতে পারে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ। ইতিমধ্যে নতুন নেতৃত্বের সন্ধান শুরু করেছেন খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে সার্বিক সহযোগিতা করছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।শেখ পরশ রাজনীতিতে আসতে না চাইলে শেখ মণির ছোট ছেলে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টা ফজলে নূর তাপসকে যুবলীগের চেয়ারম্যান করা হতে পারে। তাপস রাজনীতিতে আসার পর নিজের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সংসদ সদস্য হিসেবেও তিনি ঢাকায় বেশ জনপ্রিয়।যুবলীগের আসন্ন সম্মেলনে চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ বাদ পড়ার ঝুঁকিতে আছেন বলে যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে যুবলীগ চেয়ারম্যান আড়ালে চলে গেছেন। সবশেষ গত শুক্রবার দলটির প্রেসিডিয়াম সভায় অংশ নেননি ওমর ফারুক। তার বিরুদ্ধে ক্যাসিনো হোতাদের কাছ থেকে সুবিধাভোগ করার অভিযোগ রয়েছে।সংগঠনে ওমর ফারুকের কথাই ছিল শেষকথা। আওয়ামী লীগের একমাত্র সংগঠন, যেখানে কর্মীরা তাদের সংগঠনের প্রধানকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিজের অনুগতদের বসিয়েছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান। ঢাকা মহানগর ও দেশব্যাপী জেলা কমিটিগুলোও হয়েছেন তার পকেটের লোক দিয়ে।
নিজেকে তরুণ ভাবাপন্ন ৭১ বছর বয়সী ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একক ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। শুরুতে সাবেক নেতাদের পরামর্শ ছাড়াই একটি ঢাউস কমিটি গঠন করেন তিনি। অভিযোগ আছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি অনেক নেতাকে কমিটিতে স্থান দিয়েছেন। পদভেদে ১০ লাখ থেকে শুরু করে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। ফ্রিডম পার্টি ও যুবদলের অনেকে টাকার বিনিময়ে ঠাঁই পেয়েছেন যুবলীগে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন।
যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা জানান, বিগত সাত বছরে তারা চেয়ারম্যানের ভয়ে তটস্থ ছিলেন। মুখ বুজে সব অপকর্ম সহ্য করেছেন। সংগঠনে সব সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে নিয়েছেন। আমাদের শুধু সম্মতি দিতে হয়েছে। তার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত দিলেই তাৎক্ষণিক বহিষ্কার, অফিসে আসতে বারণ পর্যন্ত করা হয়েছে। তারা বলেন, তার সব অপকর্ম জায়েজ করার মেশিন ছিল যুব জাগরণ প্রকাশনা। এখান থেকে নানা বই ও প্রকাশনা বের করে সবার কাছে ভালো সাজার চেষ্টা করতেন। পুরো সাত বছরে যুবলীগ বলতে আমরা শুধু তাকেই বুঝতাম।
এমন অবস্থায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংগঠন নিয়ে চরম হতাশা সৃষ্টি হয়। তবে শুদ্ধি অভিযানের পর দৃশ্য বদলাতে শুরু করেছে। ওমর ফারুক চৌধুরী গত কয়েকদিনে একবারও যাননি ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।
আবারও সাধারণ সম্পাদক কিংবা চেয়ারম্যান পদে থাকতে চান কিনা জানতে চাইলে ৬৫ বছর বয়সী হারুনুর রশিদ বলেন, নেত্রী (শেখ হাসিনা) যাকে চাইবেন তার নেতৃত্বেই যুবলীগ চলবে। তবে নেতৃত্বের বিষয়ে বয়সের সঙ্গে অভিজ্ঞতাও দেখা উচিত।এরপরও ভেতরে ভেতরে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। যুবলীগের বর্তমান কমিটির একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য শীর্ষ দুই পদের একটি পেতে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান আতা, মো. ফারুক হোসেন, আবদুস সাত্তার মাসুদ, অ্যাডভোকেট বেলাল হোসাইন, ইঞ্জিনিয়ার নিখিলগুহ প্রমুখ সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বেশ সময় দিচ্ছেন।
দুজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও শীর্ষ দুই পদের একটি পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা হলেন মহিউদ্দীন আহমেদ মহি ও সুব্রত পাল।
এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য ভেতরে ভেতরে লবিং করে যাচ্ছেন।
ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা ছিলেন কিন্তু বর্তমানে কোনো দায়িত্বে নেই- এমন একাধিক সাবেক ছাত্রনেতাকে নিয়েও ভাবনা চলছে যুবলীগের শীর্ষ পদের জন্য। সেক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন এমন নেতারা প্রাধান্য পাবেন। এছাড়া ছাত্রলীগের ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে এমন একাধিক ব্যক্তিকে যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ দেয়া হতে পারে। বাদ পড়তে পারেন বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে অনেকে। সেখানে বর্তমান কমিটির সম্পাদকীয় পদ থেকে কাউকে কাউকে পদোন্নতি দেয়া হতে পারে।এসবই সম্ভাবনার কথা। এবারের কংগ্রেসে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কথাই হবে শেষ কথা। তিনি নিজেই যুবলীগকে ঢেলে সাজাবেন বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *