জুলাই ২৭, ২০২১

ভালো আছেন কমেলারা

১ min read

নিজস্ব প্রতিবেদক : মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারের। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় তারা ২ শতাংশ জমিসহ পেয়েছে পাকা ঘর। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব ঘর বিতরণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন তিনি বলেছিলেন, মুজিববর্ষে একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। আমরা সবার জন্য ঠিকানা করে দেব, সবাইকে ঘর করে দেব। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যেন সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে সেটাই আমার লক্ষ্য।

সেই লক্ষ্যের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরই পাকা ঘর পচ্ছে আরও এক লাখ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার। এর মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ৫০ হাজার পরিবারকে ঘর বুঝিয়ে দেয়া হবে। এরপর জুন-জুলাইয়ে পাবে আরও ৫০ হাজার পরিবার। সারাদেশে যারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় জমিসহ পাকা ঘর পেয়েছেন তারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘরে তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করছেন। তাদের অনেকেই এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাদের নিজেদের একটি পাকা ঘর হয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশসহ দোয়া করছেন প্রতিনিয়তই।

এদিকে, দ্বিতীয় ধাপের ৫০ হাজার নতুন ঘর নির্মাণের কাজ আগামী ৭ এপ্রিলের মধ্যে শেষ করতে গত বৃহস্পতিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার, ডিসিসহ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বিষয়ে একটি সমন্বয় সভা হয়। সেখানেই বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়। -খবর বিডিনিউজের

প্রথম ধাপে প্রায় ৭০ হাজার পরিবারকে দেয়া পাকা ঘরে রয়েছে দুটি শোবার ঘর, রান্নাঘর ও বাথরুম। ইটের দেয়াল, ওপরে টিনের চাল। প্রতিটি ঘরের জন্য বরাদ্দ ছিল এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, এবার আমরা যে ঘরটি করব, তার নকশায় ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন এসেছে। প্রধানমন্ত্রী মনে করেছেন যে বাজেটটাও আরেকটু বাড়িয়ে দেয়া দরকার। সেজন্য ঘরপ্রতি ২০ হাজার টাকা বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে যেসব ঘর বানানো হয়েছে, তার মান সারাদেশে ‘প্রশংসা পেয়েছে’ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব বলেন, সেই মান ধরে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম ‘সহ্য করা হবে না’।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এই ঘরে থাকার পরে তাদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন দৈনিক জবাবদিহির জেলা প্রতিনিধিদের।

ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের চরসুলতানপুর খালপাড় ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ সড়কে আশ্রিত পদ্মার ভাঙনকবলিত কমেলা বেগম (৩৭) দীর্ঘ ১২ বছর পর মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন।

কমেলা বেগম জানান, উপজেলার চরহরিরামপুর ইউনিয়নের বিশাই মাতুব্বর ডাঙ্গী গ্রামের পদ্মা পারে তার আদি বসতি ছিল। ২০০৮ সালে পদ্মা নদীর ভাঙনে তার বসত ভিটা বিলীন হয়ে যায়। তার দুই মেয়ে এক ছেলের সংসার নিয়ে উপজেলার কোথাও মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই মেলেনি। নিঃস্ব পরিবার হিসেবে উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের খালপাড় ডাঙ্গী গ্রামের বেড়িবাঁধ সড়কের এক পাশে খুপরি ঘরে বসতি শুরু করেন। এরপরই কমেলার স্বামী লাবলু সেখ স্ত্রী-সন্তান ফেলে রেখে উধাও হন। স্বামী পরিত্যক্তা নারী হিসেবে বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে এবং কর্মসৃজন প্রকল্পে রাস্তায় রাস্তায় মাটি কেটে মহিলা মজুরের কাজ করে সন্তানদের বড় করতে থাকেন।

কমেলা বেগম জানান, দিনভর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ করে সরকারিভাবে জমিসহ ঘর পাব তা কোনোদিন চিন্তাও করি নাই। প্রধানমন্ত্রীর দয়ায় ঘর হয়েছে, এখন পুলাপান মানুষ করতে পারবে বলেও তিনি জানান। কমেলা জানান, এখন রাতে বাড়ির উঠোনে চাঁদের আলোতে ছেলে-মেয়ে যখন খেলা করে, সেই সুখ যে কি তা ভাষায় বোঝানো যায় না। চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানা বলেন, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারে জমিসহ ঘর প্রদান প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় মোট ১৫০টি জমিসহ ঘর প্রদান করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মোতালেব হোসেন মোল্যা বলেন, এ বছর জমিসহ ঘর পাইতে কোনো দুঃস্থ পরিবারের একটি টাকাও খরচ হয় নাই। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এ বছর জমিসহ ঘর প্রদান করা হয়েছে।

জেলার মধুখালী উপজেলার মাকরাইল গ্রামের বাসিন্দা দুলু শেখ (৩০)। জন্ম থেকেই চোখে দেখতে পান না। দুলুর বয়স যখন দুই বছর তখন পিতা হান্নান শেখ মারা যান। মাতা ছবিরন নেছা দুলুকে বড় করে তোলেন। পিতা হান্নান শেখ বেঁচে থাকতে থাকতেন অন্যের জমিতে। হান্নান শেখ মারা যাওয়ার পর দুলু ও তার মা ছবিরন নেছাকে ওই জমি থেকে বের করে দেয়া হয়। এরপর থেকেই মা-ছেলে কখনো এ বাড়ি আবার কখনো ও বাড়ি এভাবেই রাত কাটাতে থাকেন। অন্ধ ছেলেকে নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে যা উপার্জন হয় তা দিয়েই চলে তাদের দুজনের।

মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি পাকা ঘর পেয়েছেন অন্ধ দুলু শেখ। মা ছবিরন নেছাকে নিয়ে সেখানেই উঠেছেন তিনি। ঘর পেয়ে মা-ছেলের চোখে মুখে আনন্দের শেষ নেই। মা-ছেলের মুখে ফুটে উঠেছে শান্তির হাসি, এখন মাকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন অন্ধ দুলু।

অন্ধ দুলু শেখ বলেন, জন্মের পর থেকে দুনিয়ার আলো দেখতে পারি নাই। মায়ের হাত ধরেই চলছি। কোনোদিন ভাবি নাই, নিজের একটা থাকার জায়গা হবে, তাও আবার পাকা ঘর। যদিও কাঁচা ঘর বা পাকা ঘর কিছুই দেখতে পাই না আমি, তবে অনুভব করি। চোখে দেখতে না পেলেও মায়ের চোখ দিয়েই আমি সবকিছু দেখি। তিনি বলেন, আমাকে নিয়ে মায়ের অনেক সমস্যা হয়। তারপরও মা আমার কথা চিন্তা করে আব্বা মারা যাওয়ার পরও অন্যকিছু ভাবেনি। ঘরতো পেলেন এবার বিয়ে করবেন না প্রশ্ন করা হলে তিনি মুচকি হেসে বলেন, ঘর পেয়েছি, এখন বিয়েতো করতে পারিই। দুলু শেখের মাতা ছবিরন নেছা বলেন, আমাদের ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। পাকা ঘরে থাকব ভাবতেই পারি নাই। আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলেন তিনি।

শুধু দুলু শেখই নয় নতুন ঘর পেয়ে খুশি প্রতিবন্ধী সেকেন্দার আলী (৩৫)। উপজেলার মথুরাপুর এলাকার বাসিন্দা সেকেন্দার আলী থাকতেন সরকারি খাস জমিতে কোনরকমে একটি ছাপরা উঠিয়ে। সেকেন্দার আলীর পায়ে সমস্যা, তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। তিনি দুই ছেলে ও ১ মেয়ের জনক। কোনোরকমে সুতা তৈরির কাজ করে নিজের সংসার চালাতেন। জমি কেনা বা ঘর তৈরির কোনো আর্থিক ক্ষমতা ছিল না তার। তিনি পেয়েছেন মথুরাপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি পাকা ঘর। ঘর পাওয়ায় তার স্ত্রী ও সন্তানদের মুখে হাসি ফুটেছে। সেকেন্দার আলী বলেন, আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। যা রোজগার করি তা দিয়ে সংসার খরচই চালানো সম্ভব হয় না। জমি কিনব কীভাবে, আর ঘর করব কীভাবে। সরকারিভাবে ঘর পেয়ে আমি খুব খুশি। আমি আমার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালোভাবে এখন বসবাস করতে পারছি। কৃতজ্ঞতা জানাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে ১৪৮ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে দেয়া হয়েছে ‘স্বপ্নের নীড়’।

নাটোর প্রতিনিধি: মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পেয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছেন নাটোরের মালিকরা। নাটোরের ৭ উপজেলায় গৃহহীনদের জন্য ৫৫৮টি ঘর দেয়া হয়েছে। নাটোর বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগরের কৈচর পাড়া গ্রামের মৃত কছিম উদ্দিনের মেয়ে ঝুরমান বেওয়া প্রধানমন্ত্রীর উপহার ঘর পেয়ে এখন অনেক সুখে দিন পার করছেন। তিনি বলেন, মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতাম। আমার নিজের কোনো ঘর ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘর পেয়েছি। এখন আর রোদে-বৃষ্টিতে কষ্ট করতে হয় না। আগের চেয়ে আমি এখন অনেক সুখে আছি।

এদিকে নাটোর নলডাঙ্গা উপজেলা ব্রহ্মপুত্র ইউনিয়নের ইয়ারপুর গ্রামে চার পরিবার ঘর পেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞা প্রকাশ করে নার্গিস বেগম বলেন, আমরা কল্পনাও করতে পারিনি যে পাকা বাড়িতে থাকতে পারব। যা বর্তমান সরকার আমাদের প্রদান করেছে।

নার্গিস বেগম বলেন, আমরা খাস জমিতে কোনো রকমে থাকতাম। সব সময় চিন্তায় থাকতে হতো। কখন কারা আমাদেরকে এই অস্থায়ী জায়গা থেকে তাড়িয়ে দেবে। এখন আর চিন্তা নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের থাকার জন্য পাকা বাড়ি দিয়েছেন। এজন তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
সাইদুল আলম বলেন, কখনো ভাবিনি যে পাকা বাড়িতে থাকতে পারব। সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যা উপার্জন করি তা সংসার খরচ চলে না। আর পাকা বাড়ি তো স্বপ্নে দেখার মতো। আজ পাকা বাড়ি পেয়েছি এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে কি বলে ধন্যবাদ জানাব তার ভাষা নেই। আল্লাহ তাঁকে দীর্ঘ হায়াত দান করুন।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি: পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়ের মান্দুলপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাসেন আলী। পেশায় দিনমজুর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানুষের বাড়িতে বসবাস করলেও এবার তার ভাগ্যে জুটেছে নিজের বাড়ি। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সরকার যে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের বাড়ি তৈরি করে দিয়েছে সেই প্রকল্পের নতুন ঘর পেয়ে আনন্দিত দিনমজুর হাসেন আলী। হাসেন আলী একই এলাকার কসিম উদ্দিনের ছেলে। নতুন বাড়ি পেয়ে ভালোই দিন যাচ্ছে এখন হাসেন আলীর পরিবারের। তিনি জানান, আমি গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই, আমার কোনো জমি কিংবা ঘর ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে নতুন ঘর দিয়েছেন। এক মাস আগে আমি প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ঘরে উঠেছি এবং বসবাস করছি পরিবার পরিজন নিয়ে। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই কারণ তিনি আজ আমাদের মতো গরিব মানুষদের বসবাসের জন্য ঘর করে দিয়েছেন। একই কথা বলেন, হাসেন আলীর স্ত্রী শাহানাজ বানু, তিনি আনন্দ ও উল্লাসে বলেন, হামরা গরিব মানুষ, হামার জমিজমা এমনকি থাকার কোনো ঘর নাই। সরকার হামাক নতুন ঘর দিছে, হামরা এলা নতুন ঘর পায় অনেক সুখে আছি।

এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সোহাগ চন্দ্র সাহা বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে তেঁতুলিয়া উপজেলায় মোট ১৪৬টি ঘর বরাদ্দ পেয়েছি। এই ঘরগুলো আমরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সহায়সম্বলহীন ও ভূমি- গৃহহীনদের মাঝে বরাদ্দ দিয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *