জুলাই ৩০, ২০২১

করোনা

করোনা

স্বাস্থ্যবিধিতে আবার নির্দেশনা

আসাদুজ্জামান সুপ্ত : আচমকাই দেশে বাড়তে শুরু করেছে করোনা শনাক্ত নতুন রোগীর সংখ্যা। গত বুধবার (১০ মার্চ) থেকেই শনাক্তের এ হার ঊর্ধ্বমুখী। শুধু নতুন রোগীই নয় একই সঙ্গে বাড়ছে ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যাও। বিশেষজ্ঞরা এ ঊর্ধ্বগতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন, সেইসঙ্গে তারা স্বাস্থ্যবিধিতে জোড় না দিলে দেখছেন বড় বিপদও।

গত দুই থেকে আড়াই মাস দেশে করোনা শনাক্তের হার ছিল সহনীয় পর্যায়ে। একসময়ে এ হার নেমে আসে ২ শতাংশেরও নিচে। দীর্ঘসময় ধরে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করায় বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল দেশে করোনা সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দৈনিক হিসাব বিবেচনা করে জনসাধারণেও নেমে এসেছে বেপরোয়া মেজাজ। শুধু মফস্বলই নয়, রাজধানী ঢাকায়ও স্বাস্থ্যবিধির নিয়ম তোয়াক্কা না করে স্বাভাবিক জীবন শুরু হয়েছে। যার ফলে উদ্বেগ বাড়ছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এবিএম খুরশীদ আলম সবাইকে সতর্ক করে বলেন, গত দুই মাস আমরা স্বস্তিতে ছিলাম, তাই এখন আমরা কোনো কিছু মানছি না। সামনের দিকে আমরা আরও বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছি, যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি না মানি। গতকাল রোববার ঢাকার শ্যামলীর টিবি হাসপাতালে ওয়ান স্টপ টিবি সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই তরুণ, আক্রান্তদের অনেককেই আইসিইউতে ভর্তি করা লাগছে।

খুরশীদ আলম বলেন, গত দুই মাসে আমার কাছে কখনোই আইসিইউ বেডের জন্য কোনো অনুরোধ আসেনি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে ফোন পাচ্ছি- আইসিইউ বেড পাওয়া যাচ্ছে না। আগে আমরা দেখছিলাম, যাদের কোমর্বিডিটি আছে তাদের আইসিইউ লাগত। এখন ইয়াং, ভালো, সুস্থ, তারাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

দেশে করোনার আচমকা এ ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন দৈনিক জবাবদিহিকে বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। গরমের সময়ে ইউরোপ-আমেরিকায়ও সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

তিনি বলেন, সবাইকে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সংক্রমণ প্রতিরোধী সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু তাই নয়, তিনি এ সময়ে ব্যাপক আকারে পরীক্ষা বাড়াতে বলেছেন এবং ব্যক্তিবিশেষ লক্ষণ দেখামাত্রই পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পরীক্ষা ছাড়া নিজ উদ্যোগে এ সময়ে ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন তিনি। ড. মুশতাক সবাইকে দ্রুত টিকা নেয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন। ঊর্ধ্বগতির এ কারণ নিয়ে তিনি ভাইরাসটির গতিবিধি নিয়ে পরীক্ষা চালানোর ওপরও জোর দিয়েছেন।

এদিকে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে দেশের সব হাসপাতালকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জানিয়ে ডা. খুরশীদ আলম বলেন, ইতোমধ্যে সিভিল সার্জন অফিসগুলোয় চিঠি পাঠানো হয়েছে; সারা দেশে আইসিইউগুলো প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। সব দেশে ডিভিশনাল হাসপাতাল এবং ঢাকায় যতগুলো হাসপাতাল আছে, সেগুলোর পরিচালকদের সঙ্গে বসেছিলাম, তাদের সুবিধা-অসুবিধা কার কী অবস্থা, আমরা সেগুলো শুনেছি। সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা করছি। তাদের বলেছি, যে কয়টা বেড আছে, আপনারা রেডি রাখেন। বি রেডি ফর ম্যানেজমেন্ট ফর দ্য কোভিড পেশেন্টস।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি জোরদার করতে এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এদিকে সবার স্বাস্থ্যবিধি পালনে জোর দিয়ে বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওদের চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত শনিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সম্প্রতি করোনা সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর হার গত কয়েক মাসের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংক্রমণের হার রোধের জন্য সর্বক্ষেত্রে সবার মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওদের অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে।

প্রসঙ্গত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল রোববার গত একদিনে আরও ১ হাজার ১৫৯ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার খবর দেয়; এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। দৈনিক শনাক্ত রোগীর এ সংখ্যা গত আড়াই মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এর আগে গত বছর ৩০ ডিসেম্বর এর চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের খবর দিয়েছিল অধিদপ্তর। ওইদিন মোট ১ হাজার ২৩৫ নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আর একদিনে মৃত্যুর এ সংখ্যা গত সাত সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২৪ জানুয়ারি ২০ জনের মৃত্যুর খবর এসেছিল।

গত একদিনে পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৭.১৫ শতাংশ ছিল বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর। রোববার সকাল পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৩৯৫ জন হয়েছে। আর মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৫৪৫ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে গত একদিনে বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ১ হাজার ৩৮৫ রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাতে এ পর্যন্ত সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে ৫ লাখ ১১ হাজার ৬৯৫ জন হয়েছে।

এদিন দেশে টিকা নিয়েছেন ৯৫ হাজার ৬৭৫ জন। তাতে মোট টিকাগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখ ৯৮ হাজার ৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৭ লাখ ৯৪ হাজার ১১১ এবং নারী ১৬ লাখ ৩ হাজার ৯৮৩ জন। তাদের মধ্যে ৮৮৯ জনের মাথাব্যথা, গলাব্যথা, হালকা জ্বরের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এছাড়া রোববার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মোট ৫৬ লাখ ৮০ হাজার ৬৪৩ জন নিবন্ধন করেছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এদিকে আগামী ৩০ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হবে। এ কারণে ৩০ মার্চের আগেই দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের টিকা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। রোববার মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *