শনি. সেপ্টে ২৬, ২০২০

অভিযোগের পাহাড় কক্সবাজারের এসপি মাসুদের বিরুদ্ধে!

১ min read
অভিযোগের পাহাড় কক্সবাজারের এসপি মাসুদের বিরুদ্ধে!

অভিযোগের পাহাড় কক্সবাজারের এসপি মাসুদের বিরুদ্ধে!

# দল বদলে ঘুরেছে ভাগ্যের চাকা
# মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের সন্ধান
# ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও মাদক বাণিজ্য, হোটেল থেকে চাঁদা আদায়, ভ‚মি দস্যুদের মদত

এসএম মিন্টু : জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে ২৪ তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পা রাখে এবিএম মাসুদ হোসেন।

এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি এই কর্মকর্তার।কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ আর মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা এবং ভুমিদস্যুদের মদদসহ কক্সবাজার জেলায় একক অপরাধের সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এসপি এবিএম মাসুদ হোসেন। তার বিরুদ্ধে পাওয়া গেছে অভিযোগের পাহাড়। ওসি প্রদীপসহ একাধিক সদস্য বেপরয়া হয়ে গিয়েছিল এসপির মদদে। বিভিন্ন অপকর্ম, অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারিতায় গোটা কক্সবাজারবাসী জিম্মি।

কক্সবাজারে মাদক বিরোধী অভিযানের নামে দুর্নীতি, টাকার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ী ছেড়ে দেয়া, বড় মাদক ব্যবসায়ীদের না ধরে চুনোপুটিদের ধরা, ক্রসফায়ার বাণিজ্য, অভিজাত হোটেল থেকে চাঁদা আদায় ও সংশ্লিষ্ট জেলার জামায়াত নেতাদের পুর্ণবাসনের অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠছে, সিনহা হত্যাকান্ডে কক্সবাজারে পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের ভ‚মিকা নিয়ে।

ওসি প্রদীপ বা লিয়াকতের মতো কয়েকজনের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযোগ এলেও তিনি থেকেছেন ধরাছোয়ার বাইরে। অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকতো কক্সবাজারের এক থানা থেকে অন্য থানায় বদলি করার মাঝেই। তাদের কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সায় ছিল এসপির। সিনহা হত্যাকান্ডের পর কোন তদন্ত করা ছাড়াই সাংবাদিকদের ডেকে এসপি মাসুদ বলেছেন যে, বন্দুকযুদ্ধে এক মাদক কারবারি মারা গেছে।

তার কাছ থেকে ইয়াবা ও পিস্তল উদ্ধার হয়েছে। তার এমন বক্তব্যে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেই নানারকম কানাঘুষা চলছে। এসপির জেনিফার মুনের নামে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ছাড়াও নামে বেনামে বহু সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। পুলিশের একটি সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে জানা গেছে, বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জর দক্ষিণ ওলানিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের আব্দুল কাদের হাওলাদার ও অজুফা খাতুনের ছেলে এবিএম মাসুদ হোসেন ছাত্র অবস্থা থেকেই রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের কোনো সুযোগ হাতছাড়া করেন নি। শিবিরের সাবেক সভাপতি রেজাউল করিমের মাধ্যমে চাকরি পান ইসলামী ব্যাংকে। যেখানে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২৪ তম বিসিএসে এএসপি হিসেবে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শ্বশুর আওয়ামী লীগ করে এই পরিচয়ে নব্য আওয়ামী লীগার পরিচয় দিয়ে পদ ও পদবি বাগিয়ে নেন।

সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এবং ঢাকায় কর্মরত পুলিশের এক ডিআইজির সুপারিশে ২০১৮ এর সেপ্টেম্বর মাসে কক্সবাজার জেলায় পদায়ন হয় মাসুদ। কক্সবাজারে বন্দুকযুদ্ধের নামে যে বিচার বহিভর্‚ত হত্যাকান্ড ঘটেছে তার মূল ভূমিকা পালন করেছেন পুলিশ সুপার মাসুদ।

সূত্র জানায়, ইয়াবার নামে হয়রানি, মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় নইলে ক্রসফায়ারে দেয়াসহ নানা অভিযোগ এসেছে তার বিরুদ্ধে। উড়ন্ত ইয়াবা ডন হিসেবে চিহ্নিত ১০২ জন মাদক ব্যবসায়ীকে কোটি টাকার বিনিময়ে আত্মসমর্পণের নামে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্রসফায়ারের দেয়া হয়েছে মাদক বহনকারী চুনোপুটিদের। এতে ইয়াবার রাজ্য কক্সবাজারে যেমন ছিল তেমনই আছে।

সূত্র জানায়, কক্সবাজারে প্রায় ৩০০ টি অভিজাত হোটেল রয়েছে। কোনটা থ্রিস্টার মানের। রয়েছে একাধিক ফাইভ স্টার মানের। এইসব হোটেল থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদি কোন হোটেল মালিক ওই টাকা দিতে রাজি না হন তাহলে ওই হোটেল অবৈধ কারবার হয় এমন মিথ্যা দাবি দিয়ে বন্ধের হুমকি দেয় নিজেই এসপি। হোটেল ব্যবসা চালানো এবং এসপির রেশানল থেকে বাঁচার জন্য হোটেল মালিকগণ এসপিরকে প্রত্যেক মাসে মাসোহারা দিয়ে থাকে।

তার এই মাসোহারা তুলে থাকে কক্সবাজার সদর থানার এক এসআই। ওই এসআইয়ের বাড়ি আবার বরিশালের বানাড়িপাড়া এলাকায়। এছাড়াত্ত এসপি রিলাক্স হত্তয়ার এজন্য লাবনি পয়েন্টের একটি হোটেলর রুম বরাদ্দ নিয়েছেন। সেখানে একাধিক নারী মডেলের যাতায়াত ছিল বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদন উঠে এসেছে। ওই হোটেলটির মালিক একটি আবাসন কোম্পানির। যার প্রধান কার্যালয় বনানী এলাকায়।

আবাসন কোম্পানিটি লাবনি পয়েন্টে অনেক জমি দখল করেছে। এই দখলে সায় আছে এসপির। বিনিময়ে পেয়েছেন মোটা অংকের টাকা।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কক্সবাজার এলাকায় মাদকের যেসব ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধের শিকার হয়েছে তার অধিকাংশই খুচড়া ব্যবসায়ী। যারা ইয়াবার কারবার করে শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছেন, গড়েছেন বড় বড় রাজকীয় অটতালিকা তারা থাকেন ধরা ছোয়ার বাইরে। অপরারেশন শুরু হত্তয়ার আগেই এসপি নিজে এবং তার সোর্স দিয়ে সেইসব কারবারিদের এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে বলেন।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হত্তয়ায় আবার তারা মাদকের রাজ্যের ব্যবসায় বুদ হয়ে গেছে। ইয়াবা চোরাচালানের অন্যতম হোতা হিসেবে হাজি সাইফুল করিম, টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তার ছেলে সদর ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন, তার ভাই বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিন, বদির ভাই কাউন্সিলর মৌলভী মুজিবুর রহমান, জালিয়াপাড়ার জাফর আলম ওরফে টিটি জাফর,
উখিয়ার গুয়ালিয়ার ইউপি সদস্য মোস্তাক আহমদ, কক্সবাজার শহরের বাস টার্মিনাল এলাকার কাশেম আনসারী, একই এলাকার আবুল কালাম ও তার ভাই বশির আহমদ, বাস টার্মিনাল এলাকার বার্মাইয়া আবু নফর, চকরিয়া পৌর যুবলীগ নেতা আজিজুল ইসলাম সোহেল, মহেশখালী পুঁটিবিলার মৌলভী জহির উদ্দীন এবং পৌরসভার সিকদারপাড়ার সালাহউদ্দীনসহ অনেকের সঙ্গে প্রকাশ্যে দহরম মহরম সম্পর্ক রয়েছে এসপি মাসুদের। এমনকি এদের বাড়িতে গিয়েত্ত তিনি দাত্তয়াত খেয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, এই জেলার এসপি হত্তয়ার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে লম্বা তালিকা জমা রয়েছে। যারা ওই জেলায় এসপি হন তারা সহজে আসতে চান না। এই না আসার কারণে বড় অংকের লেনদেনের ঘটনা ঘটে। কোন কোন এসপি বদলি ঠেকাতে রেঞ্জের ডিআইজিসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ২ কোটি টাকাও দিয়ে থাকেন। আর যারা কক্সবাজারে পোস্টিং চান তারা ৫ কোটি টাকা নিয়ে বসে আছেন। তবুত্ত পোস্টিং পান না। কেন এই টাকার কারবার? জানা গেছে, এই জেলার এসপি হত্তয়া মানে টাকার গদিতে বসে যাত্তয়া। টাকার বড় উৎস ইয়াবার বড় কারবার।

ইয়াবার হাট কক্সাবাজারে শত শত মাদক ব্যবসায়ী এসপিকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে থাকেন। এই টাকার পরিমাণ ২ কোটি টাকা। আর হোটেল থেকে চাঁদা আসে ৩ কোটি টাকা। প্রত্যেক মাসে একজন এসপির মাসিক আয় ৮ কোটি টাকা। একারণে কেউ কক্সবাজার জেলার এসপি পদ ছেড়ে আসতে চান না। আর জেলায় যে একবার পদায়ন হন সে আর ওই জেলা ছেড়ে আসতে চান না। জানা গেছে, মহেশখালীর ৬৮ জন জলদস্যুর আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে বাধা দিয়েছিল ওসি প্রদীপ। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে প্রদীপকে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিলেও ১৫ দিনের মাথায় প্রদীপকে টেকনাফের ওসির দায়িত্ব দেন এসপি মাসুদ। তাকে এই দায়িত্ব দেয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল।

সূত্র জানায়, কক্সবাজারে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদান করার ক্ষেত্রে সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি মূল ভূমিকা পালন করলেও মামলা থেকে রেহাই হয় পুলিশ সুপার মাসুদের সুপারিশে। কক্সবাজারে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রহিম উল্লাহ নামে রাস্তার নামকরণেরও তার ভ‚মিকা ছিল অগ্রগণ। এতে স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *