সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১

‘বিশ্ব পোলিও দিবস’ আজ

১ min read

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এখন ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে সম্মানিত। গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসঙ্ঘের সদর দফতরে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১২৫ দেশে তিন লাখ ৫০ হাজার শিশু যখন মারণব্যাধি পোলিও ভাইরাসে আক্রান্ত, ঠিক তখন ১৯৮৮ সালের ২৪ অক্টোবর আতঙ্কের সাথে দুনিয়াব্যাপী পালন হয় ‘বিশ্ব পোলিও দিবস’। রোটারি আন্তর্জাতিকের শ্রম, ঘাম, মেধা, বুদ্ধি আর অর্থ জোগানের প্রতিশ্রুতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিন্তে নির্র্ভয়েশুরু করে এই রোগ নির্মূল কর্মসূচি। প্রকৃতিতে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো পোলিও ভাইরাস দ্বারা সারা পৃথিবীর শিশুরা যখন আক্রান্ত, তখন জোনাস এডওয়ার্ড সল্ক ১৯৫২ সালে পোলিওর বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা উদ্ভাবনের ঘোষণা দেন।

এই টিকার কার্যোপযোগিতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে আরো দুই বছর। অবশেষে ১৯৫৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের আর্সেনাল ইলিমেন্টারি স্কুল দ্য ওয়াটসন হোম ফর চিলড্র্রেন, পিটার্সবার্গ পেনসেলভেনিয়াতে পরীক্ষামূলকভাবে মানব শিশুর শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করা হয়। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪টি অঙ্গরাজ্যের ১৮ লাখ শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা হয়। ১৯৫৭ সালে আলবার্ট সাবিন দুর্বলকৃত পোলিও ভাইরাস নির্মূলে দ্বিতীয় প্রকার টিকা, যেটি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় খাওয়ার টিকা হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়, আবিষ্কার করেন। দুই ধরনের টিকাই সারা পৃথিবীতে সার্বজনীনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থান, ভৌগোলিক পরিবেশ বিবেচনা করে খাওয়ানোর টিকাকেই নির্ভরযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৩৬ সালে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মরিস ব্রুডি থেকে শুরু করে অনেক বিজ্ঞানী, ভাইরোলজিস্ট, ইমিউনোলজিস্ট যুক্তরাষ্ট্র, আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশে পোলিও আক্রমণের মহামারী ঠেকাতে টিকা, ওষুধ আবিষ্কারে নিরন্তর নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। হাজার লাখ ডলার বিনিয়োগের এই গবেষণায় প্রথম সফলতা আসে জোনাস সল্কের হাত ধরে। সফল এই বিজ্ঞানীর জন্মদিন ২৪ অক্টোবরকে স্মরণীয়-বরণীয় করার জন্য রোটারি আন্তর্জাতিকের দীর্ঘমেয়াদি সফল প্রয়াস এই দিবস।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে, ইউনিসেফ ও বিল গেটস অ্যান্ড মিলিন্দা ফাউন্ডেশনকে সাথে নিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে এই কাজ সমন্বিতভাবে শুরু করে রোটারি আন্তর্জাতিক আলবার্ট সাবিনের প্রস্তুতকৃত পোলিও টিকার ওপর ভর করে। ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯ সালে ফিলিপাইনের ৫.৩ মিলিয়ন শিশুকে এই টিকা খাওয়ানো শুরু করেছিল রোটারি আন্তর্জাতিক। তাদের নিবিড় কর্ম প্রচেষ্টায় ১৯৯৪ সালের মধ্যে মহামারী আকার ধারণ করা এই রোগ দুই আমেরিকা থেকেই নির্মূল হয়।

২০০০ সালের মধ্যে চীন ও অস্ট্রেলিয়াসহ মোট ৩৬টি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পোলিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। ২০০২ সালে ইউরোপ পোলিওমুক্ত হয়। ভারতকেও পোলিও আক্রান্ত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেয়া হয় ২০১২ সালে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পোলিওমুক্তির সাফল্য অনেক বেশি গর্বের। ১৯৭৯ সাল থেকে টিকা কার্যক্রম শুরু করে সচেতন বাংলাদেশ। তবে পোলিও নির্মূলের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্তর্জাতিক, জাতীয়, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক টিকা দিবস ধারাবাহিকভাবে পালন শুরু করে ১৯৯৫ সাল থেকে। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে রোটারি ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ড, নানা শ্রেণী ও সংগঠনের সম্পৃক্ততা, সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পোলিওমুক্তির সফলতায় বাংলাদেশ খুব দ্রুত এগিয়ে যায়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদারকরণ ধারাবাহিকতায় ২৭ মার্চ ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক পোলিওমুক্ত ঘোষণার মধ্য দিয়ে সফলতার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করে বাংলাদেশ।

পোলিও রোগ ভাইরাস-ঘটিত সংক্রামক রোগ। সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁঁকির মধ্যে থাকে। এই ভাইরাস আক্রান্ত হলে আরোগ্যলাভের সুযোগ নেই। আক্রান্ত হওয়ার অনেক লক্ষণের মধ্যে গুরুতর লক্ষণ হলো- জ্বর, শ্বাসকষ্ট শেষে পক্ষাঘাত বা পঙ্গুত্ব। বিপজ্জনক এই ভাইরাস ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত খাদ্যের মাধ্যমে মুখগহ্বর দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। মলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে, শরীরে প্রবেশ করে। এই ভাইরাসের সংস্পর্শে স্নায়ুরজ্জু, স্নায়ুকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাংসপেশী নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুকোষকে আক্রান্ত করে বলে শরীর অবশ হয়ে যায়। নিম্নাঙ্গকে বেশি আক্রান্ত করে। তবে আক্রান্তের হার বেশি হলে নানা প্রত্যঙ্গে জটিলতা সৃষ্টি হয়। মস্তিষ্কে আঘাত হানে। শেষে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

‘পোলিও’ শব্দটি প্রাচীন গ্রিক ‘ধূসর’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে কিছু নির্ধারিত এলাকায় শিশুদের প্রধান এই ভয়ানক রোগটি ছিল বলে গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। আধুনিক যুগে ১৮৪০ সালে জার্মানির জ্যাকব হেইন পোলিওমাইলিটিস রোগটি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। এই রোগ যে পোলিও ভাইরাসের উপস্থিতির ফল তা খুঁজে পান কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার।

১৯১০ সালের দিকে ইউরোপ আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে নাটকীয়ভাবে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিয়মিতভাবে মহামারী সংঘটিত হতে থাকে। সাধারণত গ্রীষ্মকালে এর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ত। লাখো শিশু-কিশোর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করত।

বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট পোলিও রোগাক্রান্ত ছিলেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পোলিও ভাইরাসটির সংক্রমণ প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারের পর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *