শনি. সেপ্টে ২৬, ২০২০

বিলুপ্তির পথে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ফেরি করে বিক্রি

১ min read
বিলুপ্তির পথে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ফেরি করে বিক্রি

বিলুপ্তির পথে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ফেরি করে বিক্রি

ময়না আকন্দ, জামালপুর প্রতিনিধি : এক সময় জামালপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কুমারদের তৈরি মাটির বাসনপত্র, ফুলদানী ও মাটির তৈরি খেলনা ফেরি করে বিক্রি করতেন ফেরিওয়ালারা। ফেরিওয়ালারা হাঁক ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে ফেরি করে প্রতিদিন বিভিন্ন বাসনপত্র, ফুলদানী ও খেলনা বিক্রি করতেন। এখন ফেরিওয়ালাদের হাঁক ছেড়ে মাটির তৈরি বাসনপত্র, ফুলদানী ও খেলনা ফেরি করে বিক্রি করা প্রায় নেই বললেই চলে। বিলুপ্ত হতে বসেছে ফেরি করে মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করা।

জানা যায়, জামালপুরের মাটির তৈরি বাসনপত্র, ফুলদানী আর খেলনা ফেরি করে বিক্রি দিন দিন বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। এখন মানুষের কাছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের তেমন কোন চাহিদা নেই। আধুনিক প্লাষ্টিক পন্যের কাছে হার মেনেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্র। মানুষের কাছে এখন প্লাটিকের বাসনপত্রের চাহিদা অনেক বেশি। কুমারদের তৈরি মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা না থাকায় অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে, অনাহারে অর্ধাহারে জীবন কাটছে কুমারপাড়ায় বসবাসকারী মানুষের।

অর্থাভাবে তারা তাদের পেশাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছে না। কুমারা মাটির তৈরি বাসনপত্র বানিয়ে তা গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রিও করতে পারছে না। মাটির তৈরি বাসন, ফুলদানী আর খেলনার এক সময় খুব চাহিদা ছিলো। সে সময় বিভিন্ন ফসলের বিনিময়ে এসব জিনিস কিনে নিতো গ্রামের মানুষ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ হারিয়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি বাসনপত্র, ফুলদানী ও খেলনা। তারপরও পূর্ব পুরুষদের পেশা ছাড়তে পারেনি কুমারপাড়ার অনেক মানুষ। দূর্মূল্যের বাজারে পেশা পরিবর্তন করছে অনেকেই।

আবার অনেকেই অর্থাভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। মাটির তৈরি বাসনপত্র নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরলেও মানুষ এখন আর তা কিনতে চায় না। তাই মাটির তৈরি বাসনপত্র ফেরি করে বিক্রি এখন বিলুপ্তির পথে। কুমারপাড়ার কিছু মানুষ মাঝে মধ্যে কিছু সাহায্য সহযোগিতা পেলেও স্থায়ী কোন ব্যবস্থা হয়নি তাদের। বিলুপ্তির হাত থেকে কুমাররা তাদের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে স্থায়ী সহযোগীতার দাবী জানান।

জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলার পিংনা ইউনিয়নের বাড়ইপটল পালপাড়া গ্রামের চার সন্তানের জনক ষাটোর্ধ গৌর চন্দ্র পাল জানান, বাড়ইপটল পালপাড়া বা কুমারপাড়া গ্রামে বসবাস আমার। তার মত অনেকেই এখানে আদিকাল থেকে বসবাস করছে। সেই থেকে এই এলাকার নামকরন করা হয়েছে পালপাড়া বা কুমারপাড়া। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া গৌর চন্দ্র পালের বাপ-দাদা মাটির তৈরি বাসনপত্র, ফুলদানী ও খেলনা তৈরি করে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করতো। এখন আর মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা নেই। জাতিগত পেশা তাই ছাড়তে পারছি না। অন্য কোন কাজ করার সাধ্য নেই। তাই বাধ্য হয়েই পরিবারের সবাই মিলে সামান্য কিছু জিনিসপত্র তৈরি করে ঝাঁকায় করে বাড়িতে বাড়িতে বিক্রি করার জন্য ঘুরছি। কিন্তু মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা না থাকায় ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে জীবন করছি আমরা।

সুনীল পাল জানান, বাপ-দাদার চৌদ্দ পুরুষের পেশা ছিলো মাটির জিনিসপত্র তৈরি করা। সেই থেকে আমাদের বাড়িকে কুমারবাড়ি বলে। এছাড়া পালপাড়া বলে এলাকায় পরিচিতি আছে। আগের দিনে নৌকায় করে দেশের বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে মাটির তৈরি জিনিসপত্র নিয়ে যেত। এক সময় এই জিনিসপত্রের খুব চাহিদা ছিল। কালের পরিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ সেই চাহিদা শূন্যের কোটায়। চাহিদা না থাকায় এ পেশা আজ বিলুপ্তির পথে।

রাখাল পাল জানান, আগের দিনে ঝাঁকায় করে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ট্রেনে করে বিভিন্ন হাট-বাজারে, গ্রামে-গঞ্জে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে আবার ট্রেন দিয়ে বাড়ি চলে আসতাম। এখন আর কেউ মাটির তৈরি জিসিন নিতে চায়।

কবি কামাল হোসেন মুসা জানান, বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ পেশার মানুসদের বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। সেই সাথে আধুনিক প্লাষ্টিক পন্যের ব্যবহারও কমাতে হবে। তা না হলে এই মৃৎশিল্প একদিন ইতিহাসে পরিণত হবে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *