আগস্ট ১, ২০২১

বাংলার স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও বঙ্গবন্ধু

১ min read

শ্যামসুন্দর সিকদার : স্বাধীনতা মানে অন্যরকম সুখের এক অনুভূতি। এই অনুভবের ভেতর থাকে ভয় ও বাধাহীন এক মুক্ত সাড়ম্বর। একাত্তর সালের ৭ই মার্চে স্বাধীনতা শব্দের প্রথম প্রস্ফুটন দেখেছিলাম। তারপর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে দুরু দুরু ভয়ের ভেতর স্বাধীনতার বার্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পায়।

পরে নয় মাস অজস্র রক্তের ভেতর বাঙালির জীবন ও স্বাধীনতা শব্দটি সাঁতার কাটে। ১৬ই ডিসেম্বরে ছিল অন্যরকম মুক্তির এক উল্লাসের দিন। সেদিনই অনুভব করেছিলাম স্বাধীনতা মানে শত্রুহীন ও বারুদের গন্ধহীন আঙিনায় আমার অবাধ বিচরণের সুখ। এ সবই এখন ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের জনক।

বলাবাহুল্য, স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন সার্বভৌমত্ব। স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন নিজস্ব ভূখণ্ড। স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন নিজস্ব জনগোষ্ঠীর। স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার। কিন্তু আমাদের ইতিহাসে আমরা পাঠ করি যে, অমুক স্বাধীন নৃপতি ছিলেন। যেমন পাল বংশের সময়, পাল বংশ ছিল বাংলার স্বাধীন শাসক। পাল বংশ বৌদ্ধধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী। তখন অবশ্য যে অর্থে বাংলা বলা হয়, সে অর্থে এটাকে বলা যাবে না। পালবংশ শাসন করেছে দীর্ঘ সময় এবং তাদের গোপাল নামের যে শাসক ছিলেন, তাকে বিখ্যাত শাসক বলা হয়। তিনি অনেক ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু দেব পালের সময় তারা সেনদের কাছে হেরে যায়। তারপর সেনবংশ শাসন শুরু করে।

সুলতানি আমলে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহর নাম উল্লেখযোগ্য। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহও একটি বড় কাজ করেছিলেন। তিনি সে-সময় বিচ্ছিন্ন অনেক অঞ্চল দখল করেছিলেন এবং সেগুলোকে একটি শাসকের অধীনে আনার চেষ্টা করেন। আমরা আলাউদ্দিন হোসেন শাহর কথাও বলি, যাকে বিদ্যাপতি পঞ্চগৌড়ের সম্রাট হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই ক’জনতো খুব বিখ্যাত শাসক। শেষাবধি সিরাজ-উদ-দৌলাকে বলি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। সবই ইতিহাসের বিপ্রতীপ কথাবার্তা।

কিন্তু এই অঞ্চলের কোনো শাসকেরই সার্বভৌমত্ব ছিল না। কারণ তারা হয় নিজেদের রাজ্য বিস্তার করেছেন কিংবা নিজেদের রাজ্য রক্ষা করার জন্য অন্য রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছন। যদি তাদের অধীনে রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে পালবংশের পরে সেনবংশ কেন আবার নতুন করে সেই রাষ্ট্র দখল করল? কিংবা যদি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহও স্বাধীন বাংলার শাসক হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে কেন ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে একডালা দুর্গে আশ্রয় নিতে হলো? আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে কেন চুক্তি করতে হলো সিকান্দার লোদির সঙ্গে? এ সবই হচ্ছে সার্বভৌমত্বহীনতার কারণে। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব থাকলে একটি রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রকে আক্রমণ করতে পারে না। তার নিজস্ব ভূখণ্ডে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারে না এবং আন্তর্জাতিকভাবে এটা স্বীকৃত। আর তাই বলি সেই সার্বভৌমত্ব বাঙালির কখনো ছিল না।

সার্বভৌমত্ব নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ওহফবঢ়বহফবহপব নিয়ে অনেক শর্ত আছে। সার্বভৌমত্বের প্রথম ধারণাটি, যেটি সুসংবদ্ধ ধারণা, সেটাকে ডবংঃঢ়যধষরধহ ঃৎবধঃু বলা হয়। এটি জার্মানিতে হয়েছিল। ডবংঃঢ়যধষরধহ ঃৎবধঃু ইউরোপের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য হয়েছিল। তখন তারা এই ঞৎবধঃুর মাধ্যমে স্বীকার করেছিল যে ফ্রান্স, জার্মানি, রোমান অ্যাম্পিয়ার, ডাচ রিপাবলিক প্রভৃতি দেশগুলোর নিজস্ব অখণ্ড যে সত্তা, নিজস্ব যে ঞবৎৎরঃড়ৎরধষ রহঃবমৎরঃু, সেটির প্রতি তারা সম্মান প্রদর্শন করবে এবং এভাবেই সে দেশগুলোর স্বাধীনতার ও সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয়েছিল।

লেখক : কবি, সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ও বর্তমানে বিটিআরসির মহাপরিচালক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *