সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১

দেশের কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন শিক্ষিত তরুণেরা

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণেরা। তাদের পরশে কৃষি শিল্পে বিপ্লব হচ্ছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কৃষিকাজের প্রথাগত পদ্ধতির বিপরীতে তাঁরা করছেন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। এতে একদিকে কৃষিশ্রমিক–সংকটের চ্যালেঞ্জ যেমন মোকাবিলা করা যাচ্ছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানও হচ্ছে। পাশাপাশি কমে আসছে ফসল উৎপাদনের খরচ ও সময়।

তেমনই এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সামসুল কবির। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে তিনি কৃষিকাজ শুরু করেন। তবে ধান কাটার সময় পড়তেন বিপাকে। চড়া দাম দিয়েও কৃষিশ্রমিক মিলত না। কষ্টের ফসল কখনো কখনো মাঠেই নষ্ট হতো, ক্ষতি হতো প্রায় প্রতি মৌসুমেই। পরে জানতে পারলেন এক নতুন কৃষিযন্ত্রের কথা, যা দিয়ে গত ধানের মৌসুমে তিনি আয় করেছেন ১১ লাখ টাকা। লাভ হয়েছে সাত লাখ টাকার বেশি।

যে কৃষিযন্ত্রটি সামসুলের ভাগ্য বদলাচ্ছে, সেটি হচ্ছে কম্বাইন্ড হারভেস্টর। সামসুল কিনেছেন জাপানের ইয়ানমার ব্র্যান্ডের হারভেস্টর। এ যন্ত্র দিয়ে একই সঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়া ও বস্তায় ভরা যায়। এতে ধান কাটার প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সময় ও খরচ অনেক কম লাগে। মাঠে–ঘাটে ছড়িয়ে ধানের অপচয়ও হয় না।

দেশের বাজারে এই কম্বাইন্ড হারভেস্টর এসেছে বেশ কয়েক বছর হলো। তবে ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর বাজারে এসেছে গত বছর। বাংলাদেশে এর একমাত্র পরিবেশক কৃষি খাতে যন্ত্র সরবরাহকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরস। এসিআইয়ের বাইরে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে কম্বাইন্ড হারভেস্টর দেশের বাজারে এনেছে, সেটা অন্য ব্র্যান্ডের। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে ২০১২ সালের দিকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কৃষক আনোয়ার হোসেনও এমন একটি কৃষিযন্ত্র তৈরি করেছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের এক গবেষণা বলছে, ফসল আবাদে চাষ, সেচ, নিড়ানি, কীটনাশক প্রয়োগে ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। অথচ ফসল রোপণ, সার দেওয়া, কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার ১ শতাংশের কম।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মঞ্জুরুল আলম বলেন, গ্রামীণ শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখন কৃষিকাজ করে। ২০৩০ সাল নাগাদ তা কমে ২০ শতাংশ হবে। ফলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ছাড়া আর বিকল্প নেই। কায়িক শ্রমের বদলে যন্ত্রের মাধ্যমে কৃষিকাজে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। এখনকার প্রান্তিক কৃষিকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর ঘটাতে তরুণেরা অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারেন।

উৎপাদন খরচ কমছে

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সামসুল কবির জানান, প্রথাগত পদ্ধতিতে কৃষিশ্রমিকদের দিয়ে ফসল কাটানো, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দী করতে এক একর জমিতে খরচ হয় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা। এতে প্রতি ১০০ কেজি ধানে প্রায় ৭ কেজি ধান নষ্ট হয়। অথচ ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর ব্যবহারে একই কাজ করতে খরচ হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। আর ধান নষ্ট হয় প্রতি একরে কেবল ১ কেজি। প্রথাগত পদ্ধতিতে যেখানে ১ একর জমির ধান কাটার সব কাজ করতে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের ২ দিন লাগত, কম্বাইন্ড হারভেস্টর দিয়ে একই কাজ করা যাচ্ছে কেবল এক ঘণ্টার মধ্যেই।

সামসুল কবির এ বছরের এপ্রিল মাসে ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর যন্ত্রটি কেনেন। তিনি বলেন, ‘এই বছরের মে মাসে আমি নিজের ৭ একর জমিসহ প্রায় ১৭০ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই ও বস্তাবন্দীর কাজ করেছি। সামনের মৌসুমে আমি আরেকটি কম্বাইন্ড হারভেস্টর কেনার চিন্তা করছি।’

দাম কত

কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরস বলছে, সারা দেশে এ পর্যন্ত ৭০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর বিক্রি হয়েছে। তাদের দুই ধরনের কম্বাইন্ড হারভেস্টরের মধ্যে ট্যাংক টাইপের দাম পড়বে ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যাগ টাইপের দাম পড়বে ২৮ লাখ টাকা। সারা দেশে এসিআই মোটরসের ডিলার ৮২টি।

এসিআই মোটরসের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, সাড়ে ২৯ লাখ টাকা দিয়ে একটি হারভেস্টর কিনলে তিন মৌসুমে বিনিয়োগ উঠে যাবে। আরও পাঁচ বছরের (বছরে তিন মৌসুম) মতো এটি চালানো যাবে। তিনি আরও বলেন, কাস্তে দিয়ে ধান কেটে তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করা যাবে না। এ জন্য দরকার কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো। সরকার এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি খাতে স্বল্প সুদে যে ব্যাংকঋণ দেওয়া হয়, তার আওতায় হারভেস্টরকে আনতে হবে।

কাজ করা যায় কাদাপানিতেও

টাঙ্গাইলের আরেক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল ইমু এ বছরের শুরুতে একটি ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টর কিনেছেন। সোহেল বলেন, ‘জাপানি প্রযুক্তির এই হারভেস্টর দিয়ে জমিতে শুয়ে পড়া ধান এবং কাদাপানির ধানও কাটা সম্ভব। যন্ত্রটিতে ছয়টি সেন্সর আছে, যাতে কোনো ময়লা বা শক্ত কিছু আটকে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তখন এটি আবার পরিষ্কার করে কাজ শুরু করি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *