সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১

দুবাইয়ে বসে হুজিকে সংগঠিত করছেন এক সাবেক এমপি!

১ min read

নিউজ ডেস্ক: জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি আলকে আবারো মাঠে সক্রিয় করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন একজন সাবেক সংসদ সদস্য। এমন খবরই সম্প্রতি জানা গেছে বিশ্বস্ত সূত্রে। হুজিবিবি সংগঠনটি বাংলাদেশের জন্য হুমকি হিসেবে কাজ করছে।

সূত্র বলছে, দুবাইয়ে বসে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি আল বাংলাদেশ (হুজিবিবি)-কে সংগঠিত করছেন সাবেক সংসদ সদস্য মুফতি শহিদুল ইসলাম। তিনি ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নড়াইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই হুজিবিকে পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি দুবাই থেকে দেশে ফেরার পর হুজিবি নেতা আতিকুল্লাহ ওরফে আসাদুল্লাহ ওরফে জুলফিকার নেতাকে গ্রেফতারের পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে এই তথ্য জানিয়েছে।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, আতিকুল্লাহ হুজিবির পুরনো শীর্ষ নেতা। সে ১৯৯১ সালে দারুল মা’আরিফ মাদ্রাসায় পড়ার সময় মাওলানা আব্দুল সালাম, মুফতি আব্দুল রউফ, হাফেজ ইয়াহিয়াদের মাধ্যমে হুজিবিতে যোগ দেয়। প্রথমে সে চট্টগ্রাম মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এরপর ১৯৯৩ সালে হুজিবির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে করতে গিয়ে তালেবানের শীর্ষ নেতা মোল্লা ওমর ও আল কায়েদার শীর্ষ নেতা নিহত ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে আতিকুল্লাহ।

ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের সময় হরকাতুল জিহাদকে নতুন করে সংগঠিত করার বিষয়ে অনেক তথ্য দিয়েছে। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। আমরা এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। হরকাতুল জিহাদকে নতুন করে সংগঠিত করার নেপথ্যে আরও যারা রয়েছেন, তাদের আমরা শনাক্তসহ গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।’

১৯৮৯ সালে যশোরের মনিরামপুরের মাওলানা আব্দুর রহমান ফারুকীর হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় হুজিবির। কিন্তু ওই বছরই আফগানিস্তানের খোস্তে মাইন অপসারণের সময় মাওলানা ফারুকী নিহত হয়। তিন বছর পর ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হুজিবিবি পুনঃযাত্রা করে।

চলতি মাসের ২ তারিখে গ্রেফতার হওয়া আতিকুল্লাহকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। গত ৮ অক্টোবর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মাসুদ-উর-রহমান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় আতিকুল্লাহ। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আতিকুল্লাহ জানায়, সে চলতি বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশে আসে। দেশে এসে কারাবন্দি হুজিবির সদস্যদের মুক্তির জন্য কাজ শুরু করে। একাজে তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন দুবাইপ্রবাসী মুফতি শহিদুল ইসলাম। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের একটি বৈঠকও হয়। ওই বৈঠকে একটি কমিটি করা হয়, যারা বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে হুজিবির জন্য ফান্ড সংগ্রহ করা হবে।

কে এই মুফতি শহিদ?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আশির দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসেন মুফতি শহিদুল ইসলাম। প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেন অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কিছু আগে। আল মারকাজুল ইসলামির নামে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বাংলাদেশে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। যোগ দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে।

২০০১ সালে নড়াইল-২ আসন থেকে উপ-নির্বাচনে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের শরিক দল ইসলামী ঐক্যজোটের (অবিভক্ত) সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন মুফতি শহিদুল ইসলাম। উপ-নির্বাচনের আগে মূল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন চার হাজার ভোটের ব্যবধানে। ওই নির্বাচনের পরই আলোচনায় আসেন মুফতি শহিদ। নির্বাচনের পর তিনি প্রয়াত শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র আমির মনোনীত হন।

খেলাফত মজলিসের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা জানান, মুফতি শহিদ ২০০১ সালের নির্বাচনের কিছুদিন আগে খেলাফত মজলিসে যোগ দিয়েছিলেন।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান মুফতি শহিদ। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকলেও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা করতে চাইলেও নির্বাচন কমিশন তা বাতিল করে।

খেলাফত মজলিসের প্রভাবশালী একজন নেতা জানান, ২০১১ সালের ২১ জুলাই দলটির নায়েবে আমিরের পদ থেকে পদত্যাগ করে ওই দলের অন্তত ১৫ জন নেতাকে নিয়ে তিনি গণসেবা আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। ওই দল রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি।

জানতে চাইলে মুফতি শহিদের ছেলে মুফতি মোহাম্মদ তলহা বলেন, ‘আমার বাবা অন্তত ১০ বছর ধরে দেশের বাইরে আছেন। বর্তমানে তিনি দুবাইতে আছেন। মাস ছয়েক আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন।’

মারকাজ থেকেই উত্থান মুফতি শহিদের
১৯৮৮ সালে প্রথম আল মারকাজুল ইসলামি বাংলাদেশ নামে এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন মুফতি শহিদুল ইসলাম। এই সংস্থাটি প্রথমে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এনজিও কার্যক্রমের আড়ালে তিনি হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতেন। এই সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে ছিলেন প্রভাবশালী একজন কওমি আলেম।

মারকাজের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নব্বই দশকের শুরুতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মারকাজের কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে বাবর রোড ও শ্যামলীতে সংস্থাটির নিজস্ব সম্পত্তি রয়েছে। ওই সময়ে দেশের বিভিন্ন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির অর্থ-সহযোগিতা দিনে-দিনে পরিসর বাড়ে সংস্থাটির। এই অর্থায়নে সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ছিল।

সংস্থার একাধিক দায়িত্বশীল জানান, মারকাজের অর্থায়নে দুর্গম অঞ্চলে মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়া দরিদ্র নারীদের বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের কাজও করা হয়েছে এই এনজিওর তত্বাবধানে। কিন্তু এসবের আড়ালেই হরকাতুল জিহাদসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুটি এনজিও-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সরকার। এর একটি মুফতি শহিদের মারকাজ।

এর আগে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত আন্তর্জাতিক এনজিও ‘আদ্রা’ ও ‘আল-মারকাজুল ইসলামি’র বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের আর্থিক সহায়তা ও মহাসমাবেশে টি-শার্ট, গেঞ্জি সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে তাদের শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, সারাদেশের কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য বলা হয়েছে। একইসঙ্গে এই দুটি এনজিও’র সব ধরনের ব্যাংক লেনদেন বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে মহাসমাবেশ করে উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া মাঠে। ওই সমাবেশে রোহিঙ্গাদের সাদা টি-শার্ট ও গেঞ্জি সরবরাহে আল-মারকাজুল ইসলামির নাম উঠে আসে।

খেলাফত মজলিসের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মুফতি শহিদ দীর্ঘদিন পাকিস্তানে ছিলেন। ওই দেশেই পড়াশোনা করেন। পাকিস্তানে পড়াশোনার সময় দুবাই আসা-যাওয়া ছিল তার। ওই সময় দেশটির শেখদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের ভিত্তিতেই দেশে এসে এনজিও কার্যক্রমের আড়ালে জঙ্গি কার্যক্রম শুরু করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *