সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

ক্যাসিনো সম্রাটের সঙ্গে ওমর ফারুক চেৌধুরী

১ min read

নিউজ ডেস্ক : ২৩ নভেম্বর আওয়ামী যুবলীগের ৭ম জাতীয় কংগ্রেস। সাত বছর ধরে দোর্দণ্ড প্রতাপে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা ওমর ফারুক চৌধুরীর ইচ্ছা ছিল ওই কংগ্রেসে সভাপতিত্ব করা। এ কারণে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর যুবলীগ থেকে বাদ পড়ছেন এই আঁচ পেয়ে কংগ্রেসে যেন সভাপতিত্ব করার শেষ সুযোগটুকু তাকে দেয়া হয় সে জন্য দেনদরবার করছিলেন। কিন্তু তার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলো না। তাকে যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন যুবলীগের সাংগঠনিক নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে তার যুবলীগে রাজনীতি করার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

ওমর ফারুক চৌধুরীর বিষয়ে অভিযোগের অন্ত নেই সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। তিনি যুবলীগের রাজনীতিতে এসে অনেকটাই আঙুল ফুলে কলাগাছ। একসময় তামাকের বিকল্প টেন্ডুপাতার ব্যবসা করা ওমর ফারুক যুবলীগের রাজনীতির সুবাদে এখন গাড়ি-বাড়ির মালিক। তার অঢেল সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে। এসব করেও পার পেয়ে যাচ্ছিলেন ওমর ফারুক। অবশেষে ধরা খান ক্যাসিনোকাণ্ডে। ঢাকার ক্লাব ব্যবসার আড়ালে যারা অবৈধ জুয়ার ব্যবসা করে আসছেন, তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্য ওমর ফারুকের। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ, সহসভাপতি এনামুল হক আরমানের ক্যাসিনো ব্যবসার সুবিধাভোগী ছিলেন তিনি। রিমান্ডে দেয়া জিজ্ঞাসাবাদে এসবের সত্যতা স্বীকার করেছেন সম্রাট ও খালেদ। সম্রাট জানিয়েছেন, ভিআইপিরা তার কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়েছেন। তার ডেরা থেকে ব্যাগভর্তি টাকা নিয়েছেন। এসব ভিআইপির মধ্যে ওমর ফারুকও রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে দলীয় পদ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া স্বেচ্ছাচারিতা, ইচ্ছামাফিক পদ দেয়া-পদ বাতিল করা ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে ওমর ফারুকের বিপক্ষে।

সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে গত রোববার রাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন যুবলীগ নেতারা। ওমর ফারুক চৌধুরীসহ চার নেতা এতে অনুপস্থিত ছিলেন।

প্রথম দুজন আগে থেকেই গণভবনে নিষিদ্ধ। এদিকে উল্লিখিত চারজনের প্রত্যেককেই যুবলীগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

ক্যাসিনোকাণ্ডের শুরুতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াসহ তিন নেতার গ্রেফতারের পর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন যুবলীগ চেয়ারম্যান। তিনি ওই ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন।

প্রশাসনকেও দুষেছেন। যুবলীগের প্রশ্নবিদ্ধ নেতাদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। এর পরের দৃশ্যপট অন্যরকম। এর পর থেকেই তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে রোববার তার বিষয়ে এ অব্যাহতির সিদ্ধান্ত এলো।

তিন বছর মেয়াদি যুবলীগ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব টেনে অর্ধযুগ পার করেছেন ওমর ফারুক চৌধুরী। নানা অজুহাতে যথাসময়ে সম্মেলন করেননি তিনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আগামী ২৩ নভেম্বর সংগঠনটির সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

ব্যাংক হিসাব তলব ও বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার পর থেকেই তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিপদ বুঝে ছিটকে পড়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

নিজেকে তরুণ ভাবাপন্ন ৭১ বছর বয়সী ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একক ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। শুরুতে সাবেক নেতাদের পরামর্শ ছাড়াই একটি ঢাউস কমিটি গঠন করেন তিনি।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা জানান, বিগত সাত বছরে তারা চেয়ারম্যানের ভয়ে তটস্থ ছিলেন। মুখবুজে সব অপকর্ম সহ্য করেছেন। সংগঠনের সব সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে নিয়েছেন। আমাদের শুধু সম্মতি দিতে হয়েছে।

এখান থেকে নানা বই ও প্রকাশনা বের করে সবার কাছে ভালো সাজার চেষ্টা করতেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। দলীয় পদবাণিজ্যের অভিযোগ, স্বেচ্ছাচারিতা, ইচ্ছামাফিক পদ দেয়া-পদ বাতিল করা ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ ছিল তার নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার।

সম্রাটের ক্যাসিনোর ভাগ পেতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যুবলীগের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোতে সম্পৃক্ত ‘বিস্ময়কর’ এবং সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অনেক নেতা।

ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ছিল। তারা কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সারা দেশের জেলা-উপজেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও পদবাণিজ্য করে। দায়িত্বশীলদের এড়িয়ে একমাত্র দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের শলাপরামর্শেই চূড়ান্ত হতো চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত।

অর্থের বিনিময়ে দলে ঢুকে পড়ে বিভিন্ন এলাকায় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বিতাড়িতরাও। অর্থের বিনিময়ে দলে অযোগ্য ও প্রশ্নবিদ্ধ অনেক ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন সংগঠনের চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ‘আপনি বলছেন ৬০টি ক্যাসিনো আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনারা ৬০ জনে কি এতদিন আঙুল চুষছিলেন? তা হলে যে ৬০ জায়গায় এই ক্যাসিনো, সেই ৬০ জায়গার থানাকে অ্যারেস্ট করা হোক। সেই ৬০ থানার যে র্যা ব ছিল, তাদের অ্যারেস্ট করা হোক।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অপরাধ করলে শাস্তির ব্যবস্থা হবে। প্রশ্ন হলো- এখন কেন অ্যারেস্ট হবে। অতীতে হলো না কেন, আপনি তো সবই জানতেন। আপনি কি জানতেন না? নাকি সহায়তা দিয়েছিলেন সে প্রশ্নগুলো আমরা এখন তুলব। আমি অপরাধী, আপনি কী করেছিলেন? আপনি কে, আমাকে আঙুল তুলছেন?’

সেদিন উত্তেজিত হয়ে যুবলীগের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাকে অ্যারেস্ট করবেন? করেন। আমি রাজনীতি করি, ১০০ বার অ্যারেস্ট হব। আমি অন্যায় করেছি, আপনারা কী করেছিলেন? আপনি অ্যারেস্ট করবেন, আমি বসে থাকব না। আপনাকেও অ্যারেস্ট হতে হবে। কারণ আপনিই প্রশ্রয় দিয়েছেন।’

যুবলীগের অনেক নেতা জানান, ২০০৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন ওমর ফারুক। এর আগের কমিটিতে কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আর ২০১২ সালে হন চেয়ারম্যান।

এর পর থেকে যুবলীগে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের শীর্ষ পদ পাওয়ার পর সম্পদ নিলামে ওঠার পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন এবং ধনাঢ্য জীবনযাপন করছেন; যদিও তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই।

১৯৪৮ সালে জন্ম নেয়া ওমর ফারুক চৌধুরী সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম জেলা বিড়ি শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এইচএম এরশাদ ক্ষমতায় আসার সময় ওমর ফারুক শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

জাতীয় পার্টির প্রয়াত নেতা নাজিউর রহমান (মঞ্জু) এরশাদের মন্ত্রিসভার সদস্য হলে ওমর ফারুক দলবদল করেন। জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠন যুব সংহতির চট্টগ্রাম উত্তর জেলার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।

ওমর ফারুক চৌধুরী নাজিউর রহমানের ভায়রা এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভগ্নিপতি।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলে তিনি সদস্য হন। ১৯৯৭ সালে তিনি উত্তর জেলা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হন।

বিড়ি শ্রমিক লীগ, জাতীয় পার্টির যুব সংগঠন, আওয়ামী লীগ করেও লম্বা সময় ছিলেন পেছনের কাতারে। তবে যুবলীগ তাকে নিয়ে গেছে শীর্ষে। যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর শোধ করেছেন পুরনো ব্যর্থতার দেনা।

২০০৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন ওমর ফারুক। এর আগের কমিটিতে কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আর ২০১২ সালে হন চেয়ারম্যান। এর পর থেকে যুবলীগে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের শীর্ষ পদ পাওয়ার পর সম্পদ নিলামে ওঠার পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন এবং ধনাঢ্য জীবনযাপন করছেন। যদিও তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই।

এ নিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের সমালোচনাও আছে। যুবলীগের একাধিক নেতা জানান, চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাদের সরাসরি আলাপ করার সুযোগও কম ছিল। যুবলীগের বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। পিয়ন থেকে দফতর সম্পাদক হওয়া কাজী আনিসও ‘কমিটি–বাণিজ্য’ করে অনেক বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। আনিস এখন পলাতক।

১৯৪৮ সালে জন্ম নেয়া ওমর ফারুক চৌধুরী সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম জেলা বিড়ি শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের প্রয়াত কেন্দ্রীয় নেতা এসএম ইউসুফ ছিলেন তার রাজনৈতিক মুরব্বি। বিড়ি শ্রমিক লীগের নেতা হয়ে মিয়ানমার থেকে টেন্ডুপাতা আমদানি শুরু করেন ওমর ফারুক। তামাকের বিকল্প এ টেন্ডুপাতা বিড়ির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

তৎকালীন মন্ত্রী নাজিউর রহমানের উৎসাহে ওমর ফারুক জাতীয় পার্টির যুব সংগঠন যুব সংহতির চট্টগ্রাম উত্তর জেলার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর কিছু দিন নীরব ছিলেন ওমর ফারুক। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলে তিনি সদস্য হন। ১৯৯৭ সালে তিনি উত্তর জেলা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হন। ওই কমিটির মেয়াদ ছিল ২০০৪ সাল পর্যন্ত।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এরশাদের আমলে যুব সংহতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ওমর ফারুকের আয় বাড়তে থাকে। মালিক হন পোশাক কারখানার। ওমর ফারুক চৌধুরী নিজেও গত সোমবার বলেন, তিনি ১৯৮৮ সালে রাউজানে পোশাক কারখানা স্থাপন করেছিলেন, যা পরে চট্টগ্রাম শহরের জুবিলি রোডে স্থানান্তর করেন।

সম্পদ নিলামে ওঠার দুই মাস আগেই যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন ওমর ফারুক চৌধুরী। আওয়ামী লীগও ওই বছরের শুরুতে ক্ষমতায় আসে। পরিস্থিতি বদলাতে থাকে তার। ব্যাংকঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছেন তিনি। কিন্তু এখন আর ওমর ফারুক চৌধুরীর দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *