সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১

কোরআন সংকলনের বিশুদ্ধ ইতিহাস

১ min read

নিউজ ডেস্ক: আসলে যারা আরবের বিশুদ্ধ ইতিহাস পড়েননি, তারা কোরআন কারিমের বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ ‘জাহিলিয়াত’ এর পারিভাষিক অর্থ শুনেই হয়তো ইতোমধ্যে চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করবেন, ‘আরে তখন তো জাহিলি যুগ ছিল। অজ্ঞ মানুষগুলো আবার কীভাবে কোরআন লিখে রাখবে!’

আসলে তারা হয়তো ধরে নিয়েছেন যে, ওই যুগে আরবে কোনো লেখক বা লেখালেখির যোগ্যতাসম্পন্ন লোক ছিল না। ওই যুগে আরবে লেখাপড়ার কোনো উপকরণ ছিল না। এটি তাদের সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অন্য বিশুদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থে কথা না হয় বাদই দিলাম। তারা যদি কোরআন কারিমই ভালোভাবে অধ্যয়ন করতো তাহলে তারা এই ভুল ধারণার শিকার হতো না। কোরআন কারিমে বারবার ‘রিক্কুন, কুতুবুন, কিরতাছুন, সহিফাতুন, সুহুফুন, কলামুন, মিদাদুন, আসফারুন, আলওয়াহুন, ইত্যকার শব্দগুলো একটু মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করতো তাহলে তাদের মনে বিষয়টি স্পষ্ট হতো। এই সবগুলো ছিল লেখালেখির উপকরণ। আপনার কোরআন কারিমের অজস্র স্থানে এ শব্দগুলোর প্রয়োগ দেখতে পাবেন।

সেই যুগে লেখক বা লেখালেখির যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ কি ছিল? এ প্রশ্নের উত্তরও আপনি কোরআন কারিমের মাঝে পাবেন। আপনি বিস্ময়ের সঙ্গে সে যুগের মানুষদের যোগ্যতার চিত্র দেখুন, ‘যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।’ (সূরা বাকারা : ৭৯০)।

এরপর লেনদেনের যেই দীর্ঘ আলোচনা সূরা বাকারার শেষে পাওয়া যায়; এছাড়াও ঋণদান সম্পর্কিত লেনদেনগুলো কোরআন কারিম যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে লিখে রাখার জোর নির্দেশনা জানিয়েছে, সেগুলো সামনে রেখে ভাবুন, যদি আরবরা লেখালেখি সম্পর্কে অসচেতন ও অজ্ঞ হতো, তাহলে কোরআন কীভাবে তাদেরকে এ ধরনের নির্দেশ করতে পারে।

কোরআন কারিমে জাহিলিয়াতের অর্থ:
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে ‘জাহিলিয়াত’ শব্দের কী অর্থ? আমি বিভিন্ন জায়গায় এ কথা বলেছি যে, এ শব্দটি কোরআন কারিমের নিজস্ব পরিভাষা। বিভিন্ন স্থানে কোরআন এই নিজস্ব পরিভাষা ব্যবহার করেছে। যেমন: ১. নারী-পুরুষের মিশ্র সমাজের কথা উল্লেখ করে কোরআন বলেছে, ‘মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না।’ (সূরা আহযাব : ৩৩)। ২. আরবদের কাঁধের ওপর ‘ভাষাকেন্দ্রিক’, ‘বংশকেন্দ্রিক’ ও ‘মাতৃভূমিকেন্দ্রিক’ সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের যেই ভূত সাওয়ার ছিল, কোরআন কারিম সেটাকে ‘হামিয়াতুল জাহেলিয়্যা’ শব্দে ব্যক্ত করেছে। ৩. আল্লাহ সম্পর্কে সংশয়বাদিতার যেই মানসিকতা আরবদের গ্রাস করে রেখেছিল, কোরআন কারিম সেদিকে ইঙ্গিত করে বলেছে, ‘আল্লাহ্ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মূর্খদের মতো।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৪) এখন আপনিই বলুন, ‘জাহিলিয়াত’ শব্দের যেই বিশেষ সংকীর্ণ অর্থ আমাদের এই যুগের অজ্ঞ ও অসচেতন মানুষরা বুঝে নিয়েছে, উপরের তিন আয়াতের কোনো আয়াতে কি এ শব্দের সেই অর্থ প্রযোজ্য হয়? বাস্তবতা হলো, ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষার বিপরীতে আরবদের মাঝে নৈতিকতা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যেই অনৈসলামিক জীবনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, বা তাদের মাঝে যেই ইসলামপরিপন্থী বৈশিষ্ট্যসমূহ ছিল, মূলত কোরআন সেটাকেই ‘জাহিলিয়াত’ শব্দে ব্যক্ত করেছে।

এখন যদি কেউ এ কথা বলে যে, ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে আরবের লোকজন লেখাপড়া জানতো না। এ কারণেই কোরআন সেই যুগকে জাহেলি যুগ বলেছে। এ ধরনের কথা একমাত্র সে লোকদের পক্ষেই বলা সম্ভব, যারা নিজেরাই কোরআনও জানে না, জাহেলি যুগের ইতিহাসও জানে না। বাইরের সাক্ষ্য কোরআন কারিমের নিজস্ব ও অভ্যন্তরীণ প্রমাণাদির আলোচনা শেষ হলো। এবার আমরা বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে আহরিত কিছু প্রমাণ ও সাক্ষ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরব। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম শিয়ামতাবলম্বী পণ্ডিত আল্লামা তাবারসি ((Shaykh Tabarsi) এর চিন্তাধারা তুলে ধরা সঙ্গত মনে করছি। তিনি তার তাফসিরগ্রন্থ ‘মাজমাউল বয়ান’ এর মাঝে একটি সঠিক কথা লিখেছেন, ‘কোরআন তার আদি রূপ সহকারেই বিগত প্রজন্মগুলো থেকে পরবর্তী প্রজন্মগুলোর কাছে পৌঁছেছে। পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন নগরীর অস্তিত্ব যেমন অনস্বীকার্য বাস্তবতা, বড় বড় ঘটনা-অপঘটনা ও প্রশিদ্ধ গ্রন্থগুলোর অস্তিত্ব যেমন অনস্বীকার্য বাস্তবতা, তেমনই কোরআনের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অবিকৃত স্থানান্তরও অনস্বীকার্য বাস্তবতা।’

তার কথাটি আদতেই সত্য। এ যুগে কেউ যদি নিউইয়র্ক বা লন্ডনের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করে তাহলে সবাই তাকে পাগল বলবে। বা কেউ যদি বিশ্বযুদ্ধের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তাহলে সবাই তাকে পাগল মনে করবে। এগুলোর অস্তিত্ব যেমন অনস্বীকার্য বাস্তবতা, তেমনই যুগ যুগ ধরে কোরআন কারিমের অবিকৃত রূপও অনস্বীকার্য বাস্তবতা। বিগত তেরোশ বছরের দীর্ঘ মুদ্দতে এক মুহূর্তের জন্যেও কোরআন যেমন মুসলমানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি, তেমনি মুসলমানও কোরআন থেকে এক মুহূর্তের জন্যে বিচ্ছিন্ন হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআন কারিমকে যে অবয়বে রেখে গিয়েছিলেন, সেই অবয়বেই কোরআন বিদ্যমান রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের হাতে কোরআন সোপর্দ করে গিয়েছিলেন, তাদের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে। সেই মহান প্রজন্ম এই কোরআনকে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সোপর্দ করেন। যাদের সংখ্যা, কোনো ধরনের বাহুল্য ব্যতিরেকে কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে, এক স্তর থেকে পরবর্তী স্তরের কাছে লিখিত অবয়বে কোরআন স্থানান্তরিত হয়ে চলে এসেছে। কোরআন কারিম তো অনেক ঊর্ধ্বের গ্রন্থ, ইমাম সিবওয়াই (রহ.) এর আরবি ব্যাকরণের নাহভ সম্পর্কিত কিতাব বা উসুলে নাহভের ওপর ইমাম মুযানি (রহ.) এর কিতাবের মাঝেও কেউ নিজ থেকে কোনো তথ্য যুক্ত করার চেষ্টা করে তাহলে আল্লামা তাবারসির ভাষায়, ‘যদি সিবওয়াই বা মুযানির বইপত্রের মাঝে কোনো ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে কোনো বিষয় যুক্ত করার চেষ্টা করে তাহলে তৎক্ষণাৎ ধরা খাবে।’

এই গ্রন্থগুলোতে সংযোজনের অপচেষ্টার যদি এই হালত হয় তাহলে বলুন, কোরআন কারিমের মাঝে সংযোজনের সক্ষমতার সম্ভাবনা কতটুকু? কেউ যদি কোরআন কারিমের কোনো বর্ণের যবরের স্থলে শুধু পেশ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করে তাহলে পৃথিবীর যেকোনো মুসলিম রাষ্ট্রের প্রাথমিক শ্রেণি মক্তবের ছোট্ট শিশুও তাকে পাকড়াও করে ফেলবে। কারো বিশ্বাস না হলে যেকোনো স্থানে গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসুক।

কোরআন কারিমের এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, বংশপরম্পরায় অবিকৃত স্থানান্তরের বিষয়টি কোরআন কারিমের সংকলন ও গ্রন্থনার পক্ষে বাইরের উৎস থেকে প্রাপ্ত একটি দলিলমাত্র। এর বাইরে আরো অজস্র বহিরাগত দলিল ও সাক্ষ্য রয়েছে। বাইরের উৎস থেকে উদ্ভূত এসব দলিল-সাক্ষ্যকে আমি দু’টি শ্রেণিতে ভাগ করব। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে সেসব বর্ণনা ও সাক্ষ্য, যেগুলোর মাঝে কোরআন কারিমের অনেকগুলো সংক্ষিপ্ত আলোচনা বা সাক্ষ্যের ব্যাখ্যা রয়েছে। আমরা এখন সেই ‘তাশরিহি রিওয়ায়াত বা ব্যাখ্যামূলক বর্ণনাসমূহ’ সম্পর্কে আলোচনা করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *