শনি. সেপ্টে ২৬, ২০২০

কালিয়াকৈর সরকারি হাসপাতাল এখন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চৌকাট

১ min read
কালিয়াকৈর সরকারি হাসপাতাল এখন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চৌকাট

কালিয়াকৈর সরকারি হাসপাতাল এখন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চৌকাট

মো: আফসার খাঁন বিপুল, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি : গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা অতি মাত্রায় বাণিজ্যিক হয়ে পড়ায় সেবার ধস নেমে এসেছে। এতে সাধারণ রোগীরা পরে বিপাকে। কালিয়াকৈর উপজেলা তিন লক্ষাধিক লোকের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত কল্পে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গড়ে তুলেন সরকার। এটি একটি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল এছাড়াও রয়েছে ৩৪টির বেশি কমিনিউটি সেন্টার।

হাসপাতালের ডাক্তার গুলো নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। ইচ্ছেমত দিনের যে কোন সময় ডাক্তার হাসপাতালে উপস্থিত হন ও চলেও যাচ্ছেন তাদের মন মত। এবং বাকী সময় ব্যয় করেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, ডায়গনষ্টিক সেন্টার ও ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসে। যেখানে তাদের বিজিটের পরিমান ৫শ থেকে শুরু করে আরো বেশিতে দাড়াঁয়। রোগীদের উপর গুরুত্ব না দিয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থ বাণিজ্যের দিকে। এতে সাধারণ জনগন উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেনা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভুক্তভোগী রোগী সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর এ হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নতি করা হয়। অথচ এজন্য বাড়তি কোনো জন বল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই চলছে ৫০ শয্যার হাসপাতালটি। কিন্তু ৩১ শয্যা হাসপাতালে ২০ চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও চিকিৎসক আছেন ৮জন।

এর মধ্যে জুনিঃ কনঃ (সার্জারী), মেডিকেল অফিসার, মেডিকেল অফিসার কালিয়াকৈর বাজার, সহকারী সার্জন চাপাইর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ ৪ জন চিকিৎসকের পদই শুন্য রয়েছে। ৬ জন চিকিৎসক প্রেষণে আছেন। তারা হলেন, জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. সঞ্চিতা ভৌমিক, চাবাগান উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এমও ডা.গাজী মাহাবুব রহমান, এমও (ইউনানি) ডা. ইসরাত জাহান, সহকারী সার্জন ডা.তাসনুভা জাহান, সহকারী সার্জন ডা.শরিফুন নাহার, সহকারী সার্জন ডা.আ ন ম মাইনুল কুদ্দুসÑ এ ছয়জন প্রেষণে (ডেপুটেশন) আছেন। এছাড়া জুনিঃ কনঃ এ্যানেসঃ ডা. এম এম আব্দুল ওয়াদুদ ও এমও ডা. আবুল খায়ের সালাউদ্দিন ভুইয়া দীর্ঘদিন ধরে অনুনোমদিত অনুপস্থিত আছেন। ওই দুজনের নামে বিভাগীয় মামলা রয়েছে।

বর্তমানে মাত্র ৮ চিকিৎসক দিয়ে কোন রকমে চলছে এ হাসপাতালের কার্যক্রম। এদের মধ্যেও ডে অফ, ছুটি, ট্রেনিং, রাতে ও দুপুরের ডিউটি থাকেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতালে উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ চিকিৎসক তা মানছেন না। ইচ্ছা মতো তারা তাদের কর্মস্থলে যাতায়াত করছেন। এছাড়াও ওই হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা.নাজমুন নাহার থাকেন টাঙ্গাইলে। তিনিও সময় মতো আসা-যাওয়া করেন না। যার কারণে তাকে লিখিত শোকজ করলেও তিনি তার ইচ্ছা মতো চলছেন। অপর দিকে উপজেলা হাসপাতালে কয়েক জন চিকিৎসক আছেন যারা স্থানীয় কারখানা ও বিভিন্ন ক্লিনিকে চেম্বার করেছেন। তারা সে সব চেম্বারে রোগী পাঠিয়ে থাকেন।

এছাড়া ওই হাসপাতালে এক্সরে মেশিনটি ২বছরের বেশি সময় ধরে নষ্ট হয়ে আছে। তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। এসব কারণে রোগীদের চিকিৎসা খরচ বেশি হচ্ছে এবং চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বিভিন্ন ক্লিনিকে রোগী পাঠিয়ে কিছু চিকিৎসকরা কমিশনও হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর এ সুযোগে ফায়দা লুটছেন ক্লিনিক মালিকরাও। বিভিন্ন ক্লিনিকের দালালরা কৌশলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নিয়মিত রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যেন দেখার কেউ নেই।

এছাড়া জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগ গুলোতে অধিকাংশ সময়ই তাদের দেখা মেলেনা হাসপাতালে। এতে সাধারণ রোগীরা শিকার হচ্ছেন চরম ভোগান্তিতে। যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ডায়াগনষ্টিক ও ক্লিনিক গুলো চিকিৎসকদের বাণিজ্যিক হতে উৎসাহ দিচ্ছে। ফলে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান গুলো সর্বস্ব হয়ে পড়ছে।

তাছাড়া মেডিসিন, সার্জারী, অর্থোপেডিক, রেডিওলজিষ্ট ও প্যাথলজিষ্টসহ গুরুত্বপূর্ন বিভাগে কোন জনবলবৃদ্ধি করা হয়নি। চিকিৎসা সেবায় নুন্যতম প্যাথলজী, এক্সরে, আল্ট্রসনোগ্রাফীসহ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। রোগীদের চাপ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ, সরকারী ঔষধ বিতরণেও চলছে অনিয়ম। টিকেট কাউন্টারে চলছে দূর্রনীতি, তিনটাকার টিকেটের মূল্য থাকলেও নিচ্ছে পাঁচ টাকা, টাকার পরিমান বেশি দিয়ে সিরিয়াল বঙ্গ করে পেয়ে যাচ্ছে আগে টিকিট এমটার নজির রয়েছে এ হাসপাতালে। দালালদের মাধ্যমে সরকারী চিকিৎসকরা মোটা অংকের অর্থের বিনিয়মে রোগীদের পাঠিয়ে দিচ্ছে বেসরকারী হাসপাতাল ওক্লিনিক গুলোতে।

এছাড়াও কিছু চিকিৎসকের আচারণ নিয়ে কথা বলেছেন রোগীরা। রোগীদের সাথে শিয়াল-কুকুরে মত আচারণ করা হয়। এখানকার চিকিৎসক নাকি রাজা বাদশাদের মত আচারণ করে সাধারণ রোগিদের সাথে। রান্না ঘর থেকে খাবার পরিবেশনে চলছে অপরিছ্নতা। দুপুরের রান্না রাতে খাওয়ানো,খাবার পরিবেশনের সময় হাতে হান্ডগ্ল্যাপস ব্যাবহার করা হয় না কোন সময়। একটি এম্বুলেস্ন বিকল হয়ে আছে অপরটি ভাল তাকলেও তালা বদ্ধ করে রাখা হয় সব সময়, কারণ ড্রাইভারের সংকট। আর সংকট থাকবেইনা কেন, ড্রাইভার দিয়ে যদি অন্য কাজ করা হয় তবে জরুরি সেবায় এম্বুলেস্ন পাবে কি করে রোগীরা?

অফিসে সময় মতো না আসার কারণ জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নাজমুন নাহার বলেন, এটা আপনারা যেন কি করবেন? আমি সময় মতো আসি বা না আসি এটা অফিসের ব্যাপার।

কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, ৫০ শয্যা হলেও ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই চলছে হাসপাতালটি। এরমধ্যে ৪টি পদ শূন্য, ৬ জন প্রেষনে, ২ জন অনুনোমদিত অনুপস্থিত রয়েছে। তাদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ৮ চিকিৎসক দিয়ে ৫০ শয্যার হাসপাতাল চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আর ঠিক মতো হাসপাতালে না আসায় আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে (আরএমও) শোকজ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *