সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

আবরারকে হত্যা করেও অনুতপ্ত নয় অনিক, একাই স্টাম্প দিয়ে ১ ঘণ্টা পেটায় সে!

১ min read

নিউজ ডেস্ক:  আবরারকে হত্যা করেও অনুতপ্ত নয় অনিক এমনটাই জানিয়েছে সে। এছাড়া একাই স্টাম্প দিয়ে ১ ঘণ্টা পেটায় সে!

আবরার হত্যায় বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পদক মো. অনিক সরকার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। শনিবার বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলাম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় দেয়া অনিকের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারগারে পাঠানো হয়।

সূত্র জানায়, অনিক আদালতকে জানিয়েছে, সে একাই আবরারকে স্টাম্প দিয়ে অন্তত ১ ঘণ্টা পেটায়। আবরারের ওপর দেড়শ’ আঘাত করে সে। শিবির সন্দেহে স্বীকারোক্তি আদায় করতেই আবরারের ওপর নির্যাতন চালায় সে। অনিক আরও বলেছে, বাঁচার জন্য আবরার আমার পায়ে ধরেছে।

তার পরও নির্যাতন চালাই। নির্যাতনের একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়লে রাত ১২টার দিকে সে কক্ষ থেকে বাইরে যায়। আবরারকে ৫ জনের হাতে রেখে যায় সে। নির্যাতনের শেষ পর্যায়ে আবরার বমি করে। অচেতন হয়ে পড়ে। নির্যাতনকারীদের মধ্যে একজন অনিককে ফোনে তা জানালে সে (অনিক) বলে, ‘শালা ভান করছে। আরেকটু দিলে ঠিক হয়ে যাবে।’

অনিক সরকার আবার কক্ষে আসে। এরপর স্টাম্প দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে আঘাত করতে থাকে। সে খুবই অনিয়ন্ত্রিতভাবে আবরারকে মারতে থাকে। তার মারা দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়। মারার একপর্যায়ে স্টাম্প ভেঙে যায়। পরে মশারি টানানোর রড দিয়ে পেটানো হয়।

অনিক আরও বলেছে, সে আবরারকে প্রথমে কিল-ঘুষি দিয়ে ক্যাম্পাসে কারা শিবির করে জানতে চায়। তখন ইফতিও চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। একপর্যায়ে সামসুল আরেফিন ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে আসে। কথা আদায়ের জন্য ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে আবরারের পায়ে পেটায়।

এরপর দু’হাত টানটান করে স্টাম্প দিয়ে সে (অনিক) আবরারকে মারতে থাকে। আবরার চিৎকার করে কাঁদতেও পারেনি। কারণ অন্যরা আবরারের মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। এভাবে থেমে থেমে স্টাম্প দিয়ে পেটায় ইফতি, মেফতাহুল জিয়নসহ অন্যরা।

এরপর আবরারকে কক্ষে রেখে ইফতি, জিয়নসহ অন্যরা ক্যান্টিনে খেতে যায়। খাবার খেয়ে ফিরে এসে দেখতে পায় আবরার মেঝেতে পড়ে আছে। তখন আবরার বমি করছিল। তৃতীয় দফা নির্যাতনে অংশ নেয় মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল ও মুজাহিদসহ ৫ জন। অনিকের জবানিতে এভাবেই উঠে আসে আবরারের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা।

অনিক রিমান্ডেও নির্যাতন করার কথা স্বীকার করেছে বলে জানা যায়। তবে রিমান্ডে মদ্যপ অবস্থায় আবরারের ওপর নির্যাতনের কথা বললেও আদালতে তা স্বীকার করেনি বলে জানা গেছে। এমনকি মারধরের পর আবরারকে নতুন কাপড় পরানোর কথাও স্বীকার করেনি। নিজেকে সে অনুতপ্ত বলেও মনে করেনি। তবে সুযোগ পেলে সে নিজেকে শুধরাবে বলে জানিয়েছে।

আবরারকে তারা অনেকদিন থেকেই টার্গেট করে রাখে। তাদের ধারণা ছিল, আবরার শিবির করে বলেই ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট দিয়েছে। এসব বিষয়ে আবরারের মুখ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতেই ছক তৈরি করে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী হাসান রাসেল, অমিত সাহা, মো. অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল ও মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ অন্যরা।

৬ অক্টোবর কুষ্টিয়ার বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আসে আবরার। হলে আসামাত্রই তাকে ফোন করা হয়। ফোন না ধরায় রেগে যায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ওইদিন রাত সোয়া ৮টা দিকে আবরার পড়ার টেবিলে ছিল। এ সময় কক্ষে আসে মেহেদী হাসান এবং মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়ন।

মেহেদী বুয়েটে কারা কারা শিবির করে তা আবরারের কাছ থেকে বের করতে অন্যদের নির্দেশ দেয়। এ সময় মেহেদী বেশ কয়েকটি চড় মারে আবরারকে। প্রথমে চড়-থাপ্পড় দিয়ে শুরু হলেও পরে তাতেই তারা থেমে থাকেনি।

আবরারকে কক্ষ থেকে বের করে আনার পর থেকে রাত ১টা পর্যন্ত প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতন শুরুর আগে সবাই মিলে প্রথমে চারদিক থেকে আবরারকে ঘিরে ধরে। তার ল্যাপটপ, মোবাইল তল্লাশি করে। মোবাইলে আপত্তিকর কোনো পোস্ট তারা পায়নি।

পরে তারা ‘শিবির করি’ এ স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। অনিক জানায়, আবরারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল হলে কারা শিবির করে। সে কয়েকজনের নাম বলে। পরে কয়েকজনকে পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবরার যাদের নাম বলেছে তারা শিবির করে না।

আবরার মিথ্যা কথা বলার কারণে তার ওপর সবাই মিলে ক্ষিপ্ত হয়। যদিও রিমান্ডে থাকা দু’জন বলেছে, আবরার তাদের বলেছিল, সে মিথ্যা কথা বলেনি। সে নামাজ পড়ে। মিথ্যা কথা বলা তার স্বভাবে নেই। কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি।

অনিকসহ তিনজনের জবানিতে বেরিয়ে এসেছে, নির্যাতনের সময় আবরার বেশ কয়েকবার হলের ফ্লোরে শুয়ে পড়ে। তখন আবার উঠিয়ে তাকে মারা হয়। নির্যাতনকারীদের কাছে এটা ছিল থেরাপি। অনিক, সকাল ও মুজাহিদ রাতে কয়েক দফায় আবরারের কোমরের নিচে মারে।

বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে ক্রিকেটের স্টাম্প আর প্লাস্টিকের মোটা দড়ি (স্কিপিং রোপ) দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিল তারা। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লে আবরারকে মাটি থেকে তুলে আবারও পেটাতে থাকে তারা। নির্যাতনের একপর্যায়ে বমি করতে শুরু করেন আবরার।

তিনবার বমি করার পর নিস্তেজ হয়ে পড়ে তার দেহ। একপর্যায়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন আবরার।

৬ অক্টোবর আবরার খুন হওয়ার পরপরই ওই রাতে বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে যে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের একজন অনিক। সে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পঞ্চদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী। গ্রেফতারের পর ১০ জনের সঙ্গে অনিককেও ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল ডিবি পুলিশ।

এদিকে আবরার হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার আরেক আসামি মাজেদুর রহমান নওরোজকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শনিবার ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। মামলার আরেক আসামি বুয়েট ছাত্র মোয়াজ আবু হুরায়রাকে ঢাকার উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে শনিবার গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।

সে বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের ওসমানপুরের পীরপুর গ্রামে। এ নিয়ে আবরার হত্যায় শনিবার রাত পর্যন্ত ১৯ জন গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ১৫ জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *