আগস্ট ৩, ২০২১

অবদমিত মনের জটিলতার শারীরিক প্রকাশ

১ min read
অবদমিত মন

অবদমিত মন

ডা. ছাবিকুন নাহার
মেডিকেল অফিসার
ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

এক.
তখন ইন্টার্নশিপ করছি। একদিন বিকেল বেলা এক রোগী এলো। গলায় দাগ নিয়ে। হ্যাংগিং মানে গলায় ফাঁস নেয়ার ঘটনা। বাইশ কি তেইশ বছরের মেয়ে। অবয়ব জুড়ে সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি! এই মেয়ে কেনো ঝুলতে যাবে অসময়ে? কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেলো-মেয়েটার কিছু দিন আগে বিয়ে হয়েছে। বিয়ের দু’মাস পর স্বামী বিদেশ চলে গেছে। এদিকে মেয়েটির শশুরবাড়ির লোকজনের হাবভাব এমন যেন তারা বিনে বেতনের একজন ঝি পেয়ে গেছে। সেই কষ্টেই মেয়েটির আত্মহত্যার প্রচেষ্টা।

দুই.
এটাও ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা। এক ছেলে এলেন ডান হাত প্যারালাইসিস নিয়ে। শরীরের বাকি সব ঠিক আছে। শুধু ডান হাতটা প্যারালাইসিস! এটা কেমন কথা! চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে ঠিক মিলছে না তো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের অর্ধেক প্যারালাইসিস হতে পারে, যেটাকে আমরা বলি হেমিপ্যরালাইসিস। চার হাত-পা হতে পারে যাকে বলে প্যারাপ্লাজিয়া। কিন্তু একটা হাত, তাও আবার ডান হাত! ইতিহাস নিয়ে জানা গেলো-কালকের দিন বাদে পরশুদিন তার এসএসসি পরীক্ষা।

তিন.
বছর খানেক আগে তেরো চৌদ্দ বছরের এক মেয়ে নিয়ে এলো মেয়ের মা আর চাচা। এম্বুলেন্সে করে। তীব্র শ্বাসকষ্ট। চোখ বন্ধ। যায় যায় অবস্থা। আগে থেকেই ফোনে যোগাযোগ করে এসেছে। ফোনের ওপাশে চিৎকার চেচামেচি আর ভাংচুরের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। যা হোক হিস্ট্রি নিয়ে জানলাম মেয়ের বাবা মায়ের সাথে থাকেন না। আলাদা থাকেন। নারী, নেশা, মদ জুয়া এসব নিয়ে। মা আর মেয়ে কোনমতে চাচা-চাচি, দাদা-দাদির গলগ্রহে আছেন।

উপরোক্ত তিনটি ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে প্রতিটি ঘটনার একটার সাথে আরেকটা মিল আছে। ঠিক ধরেছেন তিনটি ঘটনার পেছনেই কোনো না কোনো অনুঘটক আছে যার ফলে এসব ঘটনা ঘটেছে।

প্রথম ঘটনায় নতুন বউ রেখে স্বামীর বিদেশ গমন। শশুর বাড়ির বৈরী পরিবেশ। সবাইকে শিক্ষা দিতে কিংবা ভড়কে দিতে ভিকটিম আর কীইবা করতে পারে? ফলে সহজ কাজ-হাতের কাছে আছে শাড়ি। ঝুলে পড়ো। ব্যস!

দ্বিতীয় ঘটনায় পরীক্ষাভীতি পরীক্ষার্থীকে চাপে ফেলে দিয়েছে। মন চাপ মুক্তির উপায় খুঁজেছে আর শরীর সায় দিয়েছে। ফলাফল প্যারালাইসিস। অবশ হাতে কে কবে কলম ধরে লিখতে পেরেছে শুনি! পরীক্ষা গোল্লায় যাক। আগে তো ছেলের হাত বাঁচুক!

তৃতীয় ঘটনা আরো সহজ। বাবার দায়িত্বহীন আচরণ সন্তানের মনে চাপ সৃষ্টি করেছে। সন্তানের ইমোশনাল ব্রেকডাউন হয়েছে। ফলাফল শ্বাসকষ্ট, ভাংচুর আরো অনেক অনেক ঝামেলা। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি এমনটা কেনো করলে? সে উত্তর দিলো, বাবা কেনো মাকে ডিভোর্স দিলো? আমাদের ফেলে চলে গেলো? সবাই আমাকে বলে, ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে। মেয়েটার চোখে রাগ, ঘৃণা, কান্না মাখামাখি ছিলো।

অবদমিত মনের শারীরিক প্রকাশ : যাহোক মেডিকেল সায়েন্সে এই রোগকে বলে ফাংশনাল ডিসওর্ডার। মানে অবদমিত মনের বাধাহীন বহিঃপ্রকাশ। কোনো মানুষ যদি তার কাক্সিক্ষত পরিবেশ না পায়, ক্রমশ একটা বৈরী পরিবেশে বেড়ে ওঠে, দিনের পর দিন সেই অবস্থা নিয়ে ভুগতে থাকে করে তখন তার মনে চাপ সৃষ্টি হয়। সেই চাপ থেকে ঘটেই এমন শারীরিক বিস্ফোরণ! ফলে এমন আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে থাকে।

চিকিৎসা : পেসেন্ট ইচ্ছে করে তো এই কাজগুলো করে না। পারিপার্শ্বিক বৈরী পরিবেশ তাকে এমন আচরণ করতে বাধ্য করে। কাজেই রোগীকে পর্যাপ্ত কাউন্সিলিং করতে হবে। রোগীর পরিবারকে কাউন্সিলিং করতে হবে এবং সহমর্মিতার সাথে নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা দিতে হবে। যে যে ঘটনা থেকে এই আচরণের উৎপত্তি সেসব ঘটনার সমাধান করতে হবে। সবার সহযোগিতায় সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাই পারে রোগীকে সুস্থ সুন্দর জীবনে ফেরাতে। না হলে একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। সব সময় হয়তো কপাল সহায় নাও হতে পারে। তখন হয়ত প্রিয়জনের মৃত্যুও দেখা লাগতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *