ভাঙনের মুখে বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোট


জবাবদিহি রিপোর্ট : জটিল সমীকরণে এখন বিএনপির রাজনীতি। নেতাকর্মীদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করার কঠিন কাজও নেতাদের সামনে। ২০ দল থেকে এক শরিক চলে গেছে। ঐক্যফ্রন্টের একজন ছাড়ার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। দুই জোটেরই কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিএনপি। হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল করে শপথ, ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্টে অস্থিরতা, দলীয় প্রধান জেলে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিদেশে—সব মিলিয়ে রাজনীতিতে কিছুটা বিপাকে পড়েছে বিএনপি। যে কারণে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ ও নানা ইস্যুতে মান-অভিমানের কারণে ভাঙনের মুখে পড়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোট।

২০ দলীয় জোট অটুট রেখেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিল বিএনপি। এ নিয়ে প্রথম থেকেই অসন্তোষ ছিল ২০ দলে। জোটের শরিক দলগুলো নিজেদের গুরুত্বহীন ভাবতে শুরু করেছিল। শরিক দলের কিছু নেতা এ নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার পর সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিল বিএনপি। ফ্রন্ট ও জোটের যৌথ সিদ্ধান্তে তারা অংশ নিয়েছিল একাদশ জাতীয় নির্বাচনে। নির্বাচনের পর ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংসদে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্তটিও ছিল যৌথ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একক সিদ্ধান্ত সংসদে গিয়েছে বিএনপি। এ শপথ ঘিরে ২০দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে চলছে অস্থিরতা। এরই জেরে দুই দশকের সম্পর্ক ভেঙে ২০ দল ছেড়েছে ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর দল বিজেপি। এছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। এরপরের দিনই ২০ দলের আরেক শরিক দল লেবার পার্টিও ২৩ মের মধ্যে বিএনপিকে ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার আলটিমেটাম দেয়। নতুবা ভিন্ন পথ ধরার হুশিয়ারি দেয় মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বাধীন দল। এছাড়া ২০ দলের শরিক আরও কয়েকটি দল বেরিয়ে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন শুরু হয়।

এরপেরই বিএনপির শীর্ষ নেতারা কালক্ষেপণ না করে বেশ তৎপর হয়ে ওঠেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। শরিকদের ক্ষোভ প্রশমনে গত সোমবার ২০-দলীয় জোটের বৈঠক ডাকে বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আন্দালিভ রহমান পার্থকে দাওয়াত দেয়া হলেও তিনি যোগ দেননি।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, ২০-দলীয় জোটের ঐক্য অটুট রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ২০-দলীয় জোটের উল্লেখযোগ্য শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ শুরু করেন। ফলে জোটের অন্যতম শরিক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. অলি আহমদ জোটে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে একটি বিবৃতি দেন। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমও ২০-দলীয় জোটের ঐক্য অটুট রাখার পক্ষে তার অবস্থানের কথা জানান।

ভাঙনের অন্য কারণ হলো কোনো সিদ্ধান্তেই অনড় থাকতে পারছেন না দলটির নেতারা। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নেতারা বলেছিলেন দলীয় সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। পরে তারা ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেঁধে ২০ দল নিয়ে ভোটে গেছেন। এরপর ভোটের পর ফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখান থেকে বেরিয়ে জোটের কারও সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই শেষ দিন শপথ নিয়ে সংসদে গেছেন। এছাড়া সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন নিতে যাচ্ছে দলটি। কৌশলগত কারণে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেননি। এখন ওই আসন শূন্য ঘোষণা করায় বিএনপি পুনর্নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। নির্বাচন ও শপথ ইস্যুতে এভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে ভালোভাবে নেয়নি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন- কোন পথে বিএনপি। এমতাবস্থায় ভাঙন ঠেকিয়ে জোটের ঐক্য অটুট রাখাই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এমতাবস্থায় দুই জোটকে নিয়ে বিএনপিতে চলছে চরম অস্থিরতা।

এদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও ভাঙনের সুরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গণফোরামে ভেঙে আলাদা দল গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে। আবার জেএসডি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বিএনপির সঙ্গ ত্যাগের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এসব দলের নেতাদের অভিযোগ, জোটসঙ্গী হলেও বিএনপি তাদের না জানিয়ে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব মিলিয়ে চতুর্মুখী সংকটে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে দলটিতে।

ইতিমধ্যে ‘অসঙ্গতি’ দূর করার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবৃন্দকে এক মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন ফ্রন্টের অন্যতম শরিক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

এছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোয় ব্যর্থ, প্রহসনের নির্বাচনী নাটক প্রত্যাখ্যান পরবর্তী সময়ে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহম্মদের এবং এর পরে গণফোরামের মোকাব্বির খানের শপথগ্রহণ, তাকে গেটআউট বলে বের করে দেয়া, পরবর্তীতে তাকে আবার দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সামনের সারিতে বসানো নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, শপথ ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে চলছে মনকষাকষি। শরিকদের না জানিয়ে বিএনপির ৫ সদস্য শপথ নেয়ার বিষয়টি মানতে পারছে না দলগুলো। আ স ম আবদুর রবের জাসদ, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যও এ বিষয়ে নাখোশ।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের মতো একটি ফ্রড নির্বাচনের পরও গত চার মাসে আমরা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারিনি। উল্টো সংসদে যোগদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুতরাং এগুলো নিষ্পত্তি হতে হবে। তা না হলে ঐক্যফ্রন্টের সামনে এগোনো কঠিন।’

তবে তিনি বলেন, ‘যে ধরনের ভয়ংকর এক স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় আছে তাতে জোট ছেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি।’

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, সংকট থাকলেও আলোচনা করে সেগুলো নিষ্পত্তি করা যায়। কাদের সিদ্দিকীকে যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘আশা করি দেশের সংকটকালের কথাও তিনি বিবেচনায় নেবেন। আমাদের বিশ্বাস, তিনি ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে যাবেন না।’

সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘যে যত কথাই বলুক, কে কোথায় যাবে? যাওয়ার কোনো জায়গা আছে? সরকার তো সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে ফ্রন্ট বা বিএনপিকে ছেড়ে গেলেই রাতারাতি সব সমস্যা সমাধান হবে না। জোটে থেকেই লড়াই করতে হবে।’

এদিকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বীরপ্রতীক বলেন, ‘আমরা ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে যাব এ কথা বলিনি। বরং আমরা ফ্রন্ট শক্তিশালী করার পক্ষে। তবে যে অসংগতিগুলো নির্বাচনের আগে ও পরে হয়েছে সেগুলো দূর করতে বলেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জোটে থাকব কি না সেটি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
আজকের সংবাদ শিরোনাম :
%d bloggers like this: